খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeইতিহাস-ঐতিহ্য১.৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো মুখ কি বদলে দেবে মানব বিবর্তনের ইতিহাস?

১.৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো মুখ কি বদলে দেবে মানব বিবর্তনের ইতিহাস?

প্রথম দেখায় এটিকে হোমো ইরেক্টাসের আরেকটি নমুনা বলে মনে হতে পারে। মানব বিবর্তনের ইতিহাসে হোমো ইরেক্টাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজাতি। তাদের শরীরের গঠন আগের অনেক মানব পূর্বপুরুষের তুলনায় বেশি আধুনিক ছিল এবং মস্তিষ্কও ছিল তুলনামূলকভাবে বড়।

ইথিওপিয়ায় পাওয়া প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ বছরের পুরনো একটি জীবাশ্ম মানব বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। জীবাশ্মটির নাম DAN5/P1। এর খুলিতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একদিকে হোমো ইরেক্টাসের সঙ্গে মেলে, আবার অন্যদিকে এর মুখ ও দাঁতের কিছু গঠন আরও প্রাচীন মানব পূর্বপুরুষদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই অদ্ভুত মিশ্র বৈশিষ্ট্য। কারণ, মানব বিবর্তন হয়তো এতদিন যেভাবে সরল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবা হয়েছে, বাস্তবে সেটি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।

জীবাশ্মটি ইথিওপিয়ার গোনা অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এর বয়স প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ বছর। অর্থাৎ এটি প্রাচীন প্লাইস্টোসিন যুগের সময়কার।

প্রথম দেখায় এটিকে হোমো ইরেক্টাসের আরেকটি নমুনা বলে মনে হতে পারে। মানব বিবর্তনের ইতিহাসে হোমো ইরেক্টাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজাতি। তাদের শরীরের গঠন আগের অনেক মানব পূর্বপুরুষের তুলনায় বেশি আধুনিক ছিল এবং মস্তিষ্কও ছিল তুলনামূলকভাবে বড়।

কিন্তু DAN5/P1-এর মুখের গঠন গল্পটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

জীবাশ্মটিতে মুখ, দাঁত ও খুলির বিভিন্ন অংশ পাওয়া গেছে। তবে সব অংশ অক্ষত অবস্থায় একসঙ্গে ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে মাটির নিচে থাকার কারণে খুলির বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

তাই বিজ্ঞানীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগুলো পুনর্গঠন করতে হয়েছে।

এই গবেষণায় আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

গবেষকরা জীবাশ্মের অংশগুলো পরীক্ষা করতে উচ্চ-রেজোলিউশনের মাইক্রো-সিটি স্ক্যানিং ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে জীবাশ্মের ভেতরের গঠন পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে দেখা সম্ভব হয়, অথচ প্রাচীন ও ভঙ্গুর নমুনাটিকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে হয়নি।

স্ক্যান করা তথ্য থেকে প্রতিটি অংশের ডিজিটাল মডেল তৈরি করা হয়। পরে কম্পিউটারের সাহায্যে বিচ্ছিন্ন অংশগুলো ভার্চুয়ালি সঠিক জায়গায় বসিয়ে খুলির একটি তুলনামূলকভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ তৈরি করা হয়।

এ ধরনের প্রযুক্তি এখন জীবাশ্মবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রাচীন জীবাশ্ম অনেক সময় ভাঙা বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া যায়। ডিজিটাল পুনর্গঠন বিজ্ঞানীদের সেই নমুনার প্রকৃত আকৃতি বোঝার সুযোগ দেয়।

আরও পড়ুন :  দুবাই ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়নি কেন? ব্রিটিশ আমলের চমকপ্রদ ইতিহাস

DAN5/P1-এর ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের আফ্রিকার প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর মুখমণ্ডলের গঠন আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করেছে।

জীবাশ্মটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ।

খুলির মস্তিষ্ক ধারণকারী অংশের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য হোমো ইরেক্টাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু মুখ ও দাঁতের কিছু বৈশিষ্ট্য আরও পুরনো মানব পূর্বপুরুষদের মধ্যে দেখা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রয়েছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন।

মানব বিবর্তন কি সত্যিই এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিতে সরলভাবে এগিয়েছে?

সম্ভবত না।

ধরা যাক, একটি পরিবারের সবাই একই সময়ে একই ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—মানব বিবর্তন হয়তো এমন ছিল না। বরং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে একাধিক মানবগোষ্ঠী বসবাস করতে পারে। কোনো গোষ্ঠীর শরীরে নতুন বৈশিষ্ট্য দ্রুত এসেছে, আবার অন্য কোনো গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে পুরনো বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে।

DAN5/P1 হয়তো সেই জটিল বিবর্তনীয় বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

মানব বিবর্তনের ইতিহাসে হোমো ইরেক্টাসের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রজাতি দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীতে টিকে ছিল এবং তাদের সঙ্গে মানবদেহের আধুনিক গঠনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে।

তবে হোমো ইরেক্টাস ঠিক কোথায় এবং কীভাবে বিকশিত হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

ইথিওপিয়ার এই জীবাশ্ম সেই আলোচনায় নতুন তথ্য যোগ করতে পারে।

যদি DAN5/P1-এর মস্তিষ্ককোষীয় অংশ হোমো ইরেক্টাসের মতো হয়, কিন্তু মুখ ও দাঁতে আরও পুরনো বৈশিষ্ট্য থাকে, তাহলে এর অর্থ হতে পারে শরীরের বিভিন্ন অংশ একই গতিতে বিবর্তিত হয়নি।

অর্থাৎ মুখ, দাঁত ও খুলির অন্য অংশে পরিবর্তন আলাদা সময়ে ঘটতে পারে।

এটি হোমো ইরেক্টাসের উদ্ভব সম্পর্কে অতিরিক্ত সরল ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

জনপ্রিয় ধারণায় মানব বিবর্তনকে অনেক সময় একটি সরল সিঁড়ির মতো দেখানো হয়। একটি প্রজাতি আসে, ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় এবং পরে তার জায়গা নেয় আরেকটি প্রজাতি।

কিন্তু জীবাশ্মের তথ্য বলছে, বাস্তব চিত্র সম্ভবত অনেক বেশি জটিল।

আরও পড়ুন :  ৪০০ বছর ধরে ছাদের জলই পান করেন! বারমুডার অবিশ্বাস্য জল সংরক্ষণের রহস্য

প্রাচীন মানবগোষ্ঠীগুলোর অনেকগুলো একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছে। আফ্রিকার এক অঞ্চলের মানুষ যে ধরনের শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, অন্য অঞ্চলের কোনো গোষ্ঠী হয়তো তখনও পুরনো বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছিল।

DAN5/P1-এর বৈশিষ্ট্য সেই সম্ভাবনাকেই আরও জোরালো করে।

এটি ইঙ্গিত দেয়, মানব বিবর্তন হয়তো একটি মাত্র জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক পরিবর্তনের ফল নয়। বরং একই সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ভিন্ন গতিতে পরিবর্তিত হয়েছে।

মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে গবেষণায় ইথিওপিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক মিলিয়ন বছর আগের মানব পূর্বপুরুষ ও প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবাশ্ম এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে গোনা অঞ্চল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পাওয়া জীবাশ্ম ও প্রাচীন নিদর্শনগুলো আফ্রিকার প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবনযাপন এবং বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

গোনায় পাওয়া DAN5/P1-এর মতো একটি প্রাচীন খুলির নমুনা বিজ্ঞানীদের একই সময় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পার্থক্য ও মিল খুঁজে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

এই তথ্য যত বাড়বে, ততই বোঝা সম্ভব হবে কীভাবে আমাদের দূরবর্তী পূর্বপুরুষেরা পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল এবং নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

জীবাশ্মটি শুধু হোমো ইরেক্টাসের বিবর্তন নয়, প্রাচীন মানুষের অভিবাসন নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

হোমো ইরেক্টাসকে আফ্রিকা থেকে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া প্রাচীন মানবগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তারা ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কোন পথে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

DAN5/P1-এর মতো একটি মিশ্র বৈশিষ্ট্যের জীবাশ্ম এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে সাহায্য করতে পারে।

সম্ভবত আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হোমো ইরেক্টাসের মতো বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে, পুরনো বৈশিষ্ট্যধারী কিছু গোষ্ঠী নতুন বৈশিষ্ট্যধারী গোষ্ঠীর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল।

বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ বা জিনগত বিনিময়ের সম্ভাবনাও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

তবে এখনই কোনো একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত বলে দেওয়ার মতো তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।

আরও পড়ুন :  এক তকমায় খুলে গেল আন্তর্জাতিক বাজার! গোলাপি মিনাকারীর অবিশ্বাস্য উত্থান

১৫ লাখ বছরের পুরনো এই খুলিটি রাতারাতি মানবজাতির পুরো ইতিহাস বদলে দিচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়।

বিজ্ঞান সাধারণত এভাবে এগোয় না।

বরং DAN5/P1-এর মতো আবিষ্কার পুরনো ধারণাকে নতুন তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ দেয়। এই জীবাশ্ম দেখাচ্ছে, প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর শরীরে একই সময়ে পুরনো ও নতুন বৈশিষ্ট্য পাশাপাশি থাকতে পারে।

আর এখানেই এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব।

গবেষকদের সামনে এখন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

হোমো ইরেক্টাসের উৎপত্তি ঠিক কোথায় হয়েছিল?

এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো কত দ্রুত বিকশিত হয়েছিল?

আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে কি একই ধরনের বৈশিষ্ট্য আলাদাভাবে তৈরি হয়েছিল?

একই সময়ে বসবাসকারী প্রাচীন মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক ছিল?

আর তারা কীভাবে আফ্রিকার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এবং পরে আফ্রিকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

DAN5/P1 আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানব বিবর্তনের গল্প এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

ইথিওপিয়ার মাটির নিচে প্রায় ১৫ লাখ বছর ধরে থাকা একটি মুখ এখন বিজ্ঞানীদের সামনে অতীতের এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর জানালা খুলে দিয়েছে।

এর মুখ, দাঁত ও খুলির বৈশিষ্ট্যের অদ্ভুত মিশ্রণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, হোমো ইরেক্টাসের উত্থান হয়তো প্রচলিত সরল ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।

এই আবিষ্কার মানব বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যা জানেন, তার সবকিছু উল্টে দেয়নি। বরং এটি সেই বিশাল ধাঁধায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ টুকরো যোগ করেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, এটি আমাদের শেখায় বিবর্তনের ইতিহাস সবসময় সরল রেখায় এগোয় না।

প্রায় ১৫ লাখ বছর আগের একটি মুখ আজও বিজ্ঞানীদের নতুন প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে। আর ভবিষ্যতে আরও জীবাশ্ম ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর যত সামনে আসবে, ততই পরিষ্কার হবে আমরা আসলে কোথা থেকে এসেছি এবং কীভাবে আজকের মানুষ হয়ে উঠেছি।


Discover more from News Bangla24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Table of contents [hide]

আর্কাইভ