গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার ভ্যাপসা আবহাওয়ায় ঘাম হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে তা শুধু ক্লান্তিই নয়, কিডনির জন্যও বড় ধরনের সমস্যা ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে জলশূন্যতা থাকলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তাই গরমের দিনে শুধু ঘাম নিয়ে চিন্তা না করে পর্যাপ্ত পানি পান এবং শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বর্ষাকাল শুরু হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও গরমের তীব্রতা কমেনি। বৃষ্টির পর আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় অস্বস্তিকর ভ্যাপসা পরিবেশ তৈরি হয়। এই সময়ে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে ঘাম বের হয়, যার সঙ্গে পানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজও বেরিয়ে যায়।
অনেকেই ব্যস্ততার কারণে বা তৃষ্ণা না লাগলে পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। এর ফলেই ধীরে ধীরে শরীরে জলশূন্যতা দেখা দেয়। এই অবস্থাই কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাম হওয়া কোনো রোগ নয়। বরং এটি শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ঘামের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া তরলের ঘাটতি পূরণ করা হয় না।
শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে রক্তের পরিমাণ কমে যায় এবং কিডনিতে রক্তপ্রবাহও হ্রাস পায়। ফলে কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করার কাজ ঠিকভাবে করতে পারে না। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিডনিতে পাথর তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঘন প্রস্রাব। যখন শরীরে পানির পরিমাণ কমে যায়, তখন প্রস্রাবের পরিমাণও কমে এবং তা অনেক বেশি ঘন হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় প্রস্রাবে থাকা বিভিন্ন খনিজ যেমন—
- ক্যালসিয়াম
- অক্সালেট
- ইউরিক অ্যাসিড
সহজেই একত্রিত হয়ে স্ফটিক তৈরি করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্ফটিকগুলো বড় আকার ধারণ করে কিডনিতে পাথরে পরিণত হয়।
তাই পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা থাকে এবং এসব খনিজ সহজেই শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, ফলে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
জলশূন্যতা যদি এক-দুদিনের সমস্যা না হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে কিডনির ওপর এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।
সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে—
- কিডনিতে পাথর হওয়া
- প্রস্রাবের সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই)
- কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া
- গুরুতর ক্ষেত্রে স্থায়ী কিডনি ক্ষতি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার অভ্যাস ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, যত বেশি পানি পান করা যাবে তত ভালো। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করাও কিছু ক্ষেত্রে শরীরের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
প্রতিদিন কতটা পানি প্রয়োজন, তা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—
- শরীরের ওজন
- দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম
- আবহাওয়া ও তাপমাত্রা
- বয়স
- বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যা
সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ২ থেকে ৩ লিটার পানি প্রয়োজন হতে পারে। তবে যারা বেশি ঘামেন বা বাইরে কাজ করেন, তাদের চাহিদা আরও বেশি হতে পারে।
শরীরে পানির ঘাটতি হলে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- বারবার তৃষ্ণা লাগা
- মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ হওয়া
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
- মাথা ঘোরা
- দুর্বল বা ক্লান্ত অনুভব করা
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত।
কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
তৃষ্ণা পাওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত অল্প অল্প করে পানি পান করুন।
তরল খাবার বাড়ান
ডাবের পানি, লেবুর শরবত, পাতলা স্যুপ এবং পানি সমৃদ্ধ ফল খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
প্রস্রাব চেপে রাখবেন না
দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখলে সংক্রমণ এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অতিরিক্ত লবণ কম খান
খাবারে অতিরিক্ত লবণ কিডনির ওপর চাপ বাড়ায় এবং কিছু ক্ষেত্রে পাথরের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলুন
দুপুরের প্রচণ্ড গরমে অপ্রয়োজনীয় বাইরে থাকা কমিয়ে দিন এবং প্রয়োজনে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
যাদের আগে কিডনিতে পাথর হয়েছে বা কিডনির রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি—
- কোমরের এক পাশে তীব্র ব্যথা
- প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া
- প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
- জ্বরের সঙ্গে প্রস্রাবের সমস্যা
- দীর্ঘ সময় প্রস্রাব কম হওয়া
- বারবার কিডনিতে পাথরের সমস্যা
সময়মতো চিকিৎসা নিলে বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
ভ্যাপসা গরমে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া স্বাভাবিক হলেও এর ফলে শরীরে পানি ও খনিজের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণ না করলে জলশূন্যতা দেখা দেয়, যা কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং কিডনিতে পাথরসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই গরম বা আর্দ্র আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী তরল গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলা কিডনি সুস্থ রাখার অন্যতম কার্যকর উপায়। মনে রাখবেন, কিডনির যত্ন শুরু হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতনতা থেকেই।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

