বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। নারীদের ক্ষেত্রে রজোনিবৃত্তি বা মেনোপজ একটি পরিচিত প্রক্রিয়া। তবে অনেকেই জানেন না যে পুরুষদের জীবনেও এমন একটি পর্যায় আসে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যান্ড্রোপজ। এটি কোনো রোগ নয়, বরং বয়সজনিত একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন। এই সময়ে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে, যার ফলে শারীরিক, মানসিক এবং যৌন স্বাস্থ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
অ্যান্ড্রোপজ কী?
অ্যান্ড্রোপজ হলো পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের ক্রমাগত হ্রাসের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। নারীদের মেনোপজের মতো এটি হঠাৎ ঘটে না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে শরীরে পরিবর্তন আসে। এ কারণেই অধিকাংশ পুরুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা অ্যান্ড্রোপজের পর্যায়ে প্রবেশ করেছেন।
টেস্টোস্টেরন পুরুষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। এটি শরীরের পেশি গঠন, হাড়ের শক্তি, যৌন ইচ্ছা, প্রজনন ক্ষমতা এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই হরমোনের মাত্রা কমে গেলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।
কখন শুরু হয় অ্যান্ড্রোপজ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাধারণত ২০ বছর বয়স পর্যন্ত সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকে। এরপর প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ শতাংশ হারে এই হরমোনের মাত্রা কমতে শুরু করে।
৪০ বছরের পর এই হ্রাস আরও স্পষ্ট হতে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়সের কাছাকাছি এসে অ্যান্ড্রোপজের লক্ষণগুলো প্রকটভাবে দেখা দেয়। তবে বয়স, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই সময়সীমা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
অ্যান্ড্রোপজের প্রধান লক্ষণ
অ্যান্ড্রোপজের লক্ষণ সব পুরুষের ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়, আবার কারও জীবনে এর প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
অ্যান্ড্রোপজের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো যৌন আগ্রহ বা লিবিডো কমে যাওয়া। অনেক পুরুষ আগের তুলনায় যৌন সম্পর্কের প্রতি কম আগ্রহ অনুভব করতে পারেন।
ইরেকটাইল ডিসফাংশন
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে ইরেকশন ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। এটি আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শারীরিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
আগের তুলনায় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া, কাজের শক্তি কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা অ্যান্ড্রোপজের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে সমস্যা
অনেক পুরুষ এই সময়ে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি, মনোযোগের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হন।
ঘুমের সমস্যা
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা অনিদ্রা অ্যান্ড্রোপজের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
মেজাজের পরিবর্তন
খিটখিটে মেজাজ, উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক চাপ এবং আবেগের ওঠানামা এই সময়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে ইনসুলিনের কার্যকারিতায় প্রভাব পড়তে পারে, ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
টেস্টোস্টেরন কমে গেলে শরীরে কী প্রভাব পড়ে?
পুরুষদের শরীরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের সম্পর্ক রয়েছে। এই হরমোন কমে গেলে শরীরের পেশিশক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। পাশাপাশি হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার প্রবণতা দেখা দেয়।
অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে ওজন বৃদ্ধি, পেটের মেদ জমা এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা যায়। ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং আত্মবিশ্বাস উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অ্যান্ড্রোপজ ও হৃদরোগের সম্পর্ক
টেস্টোস্টেরন শুধু যৌন স্বাস্থ্য নয়, হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই হরমোনের মাত্রা দীর্ঘদিন কম থাকলে শরীরের পেশিগুলোর কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। এর প্রভাব হৃদ্পেশিতেও পড়তে পারে।
ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। যেসব পুরুষের পরিবারে আগে থেকেই হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।
প্রজনন ক্ষমতার ওপর প্রভাব
অ্যান্ড্রোপজের সময় পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায় না। তবে শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গুণগত মান ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা আগের তুলনায় হ্রাস পেতে পারে।
তবে নারীদের মেনোপজের মতো পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রজনন ক্ষমতা একেবারে বন্ধ হয়ে যায় না। অনেক পুরুষ বয়স্ক বয়সেও সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা বজায় রাখতে পারেন।
অ্যান্ড্রোপজ মোকাবিলায় কী করবেন?
অ্যান্ড্রোপজ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং কিংবা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি সমৃদ্ধ খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ধূমপান ও মদ্যপান কমান
ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান টেস্টোস্টেরনের মাত্রা আরও দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। তাই এসব অভ্যাস থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
স্থূলতা টেস্টোস্টেরন হ্রাসের অন্যতম কারণ। তাই শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্পন্ন ঘুম হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
যদি অ্যান্ড্রোপজের লক্ষণগুলো অতিরিক্ত মাত্রায় দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞরা টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা হরমোন সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিতে পারেন।
অ্যান্ড্রোপজ পুরুষদের জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়, যা বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সবার ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো মাত্রায় দেখা দেয়। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার ফলে শারীরিক শক্তি, মানসিক স্থিতি, যৌন স্বাস্থ্য এবং হৃদ্স্বাস্থ্যে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এই সময়টিকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে অতিক্রম করা সম্ভব। বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু সুস্থ থাকা অনেকটাই নির্ভর করে নিজের যত্ন নেওয়ার ওপর।

