রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বড় শহরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, শরীরচর্চা ও সৌন্দর্য পরিচর্যার নামে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশকে ঘিরে নানা অভিযোগ উঠছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, কিছু স্পা সেন্টার বৈধ সেবার আড়ালে মাদক ব্যবসা, প্রতারণা, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ঢাকার গুলশান, বনানী, উত্তরা ও মিরপুরের মতো অভিজাত এলাকায় গড়ে ওঠা কিছু স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, ট্রেডিশনাল থাই ম্যাসাজ, অ্যারোমাথেরাপি কিংবা ডিপ টিস্যু ম্যাসাজের আড়ালে সেখানে পরিচালিত হচ্ছে অবৈধ কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কের পাশাপাশি ইয়াবা, হেরোইন, আইস, সিসাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সরবরাহ করা হয়।
ধনাঢ্য ও প্রভাবশালীদের লক্ষ্য করে ব্ল্যাকমেইল
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসব স্পা সেন্টারে যাওয়া অনেক ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি পরে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, নারী কর্মীদের মাধ্যমে গ্রাহকদের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত গোপনে ভিডিও বা ছবিতে ধারণ করা হয়।
পরবর্তীতে সেই ভিডিও বা ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক অবস্থানের কারণে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না। ফলে অপরাধচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
ফ্ল্যাটের ভেতরে গড়ে উঠছে গোপন কার্যক্রম
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ স্পা সেন্টার আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হয়। বাইরে থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্রম বোঝা প্রায় অসম্ভব।
ভেতরে একাধিক ছোট কক্ষ, স্বয়ংক্রিয় লক ব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহক প্রবেশের পর গোপন কক্ষ থেকে তরুণীদের এনে বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদর্শনের নামে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রাজধানীতে কতটি স্পা সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান হোটেল, সেলুন, বিউটি পার্লার, জিমনেসিয়াম বা ফিজিওথেরাপি সেন্টারের লাইসেন্স ব্যবহার করে ভিন্নধর্মী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ
বর্তমানে গ্রাহক সংগ্রহের কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। আগে মুখে মুখে প্রচারণা চললেও এখন ফেসবুক পেজ, টেলিগ্রাম গ্রুপ, ওয়েবসাইট এবং বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
আকর্ষণীয় ও ইঙ্গিতপূর্ণ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্ভাব্য গ্রাহকদের টার্গেট করা হয়। পাশাপাশি দালালচক্রও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তারা বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে নির্দিষ্ট স্পা সেন্টারে গ্রাহক নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুমোদন ও লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্পা সেন্টার পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন আলাদা কোনো অনুমোদন প্রদান করে না। অনেক প্রতিষ্ঠান সেলুন, বিউটি পার্লার বা ফিজিওথেরাপি সেন্টারের লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা, কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতির সুযোগে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের অভিযান ও নজরদারি
পুলিশ জানিয়েছে, মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। সম্প্রতি গুলশান-২ এলাকার একটি স্পা সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ২৮ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগও রয়েছে যে, অনেক অবৈধ স্পা সেন্টারের তথ্য তাদের কাছে থাকলেও নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বিভিন্ন মহলে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগও শোনা যায়। যদিও পুলিশ এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান থানার ওসি দাউন হোসেন বলেন, তার থানা এলাকায় স্পা সেন্টারের আড়ালে অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নেই। তিনি জানান, নিয়মিত নজরদারি চালানো হয় এবং কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অবস্থান
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, বার ও ক্লাবের পাশাপাশি স্পা সেন্টারগুলোর ওপরও তাদের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রোজউর রহমান বলেন, স্পা সেন্টারের নামে মাদক সেবন বা মাদক ব্যবসার অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বাড়িওয়ালাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, কিছু ভবনমালিক অতিরিক্ত ভাড়ার আশায় জেনেশুনে এসব প্রতিষ্ঠানকে ফ্ল্যাট ভাড়া দেন। কিন্তু অভিযানের সময় তারা নিজেদের দায় এড়াতে বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞতার দাবি করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবনমালিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক ঝুঁকি
সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিছু স্পা সেন্টার বর্তমানে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। সেখানে মাদকসেবন, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং অবাধ যৌনতার মতো অভিযোগ নিয়মিতভাবে সামনে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়; বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
তাদের মতে, অভিযানের পর অনেক প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে গা-ঢাকা দিলেও কিছুদিন পর আবার আগের কার্যক্রম শুরু করে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
কঠোর ব্যবস্থা ও সচেতনতার ওপর জোর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, লাইসেন্স যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
একই সঙ্গে তরুণ সমাজকে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্পা সেন্টারের আড়ালে গড়ে ওঠা অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে তা ভবিষ্যতে সমাজের নৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।

