Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeএক্সক্লুসিভমশা দিয়েই মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ: রোগবাহী মশা কমাতে নতুন প্রযুক্তির চমক

মশা দিয়েই মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ: রোগবাহী মশা কমাতে নতুন প্রযুক্তির চমক

তাহলে ভবিষ্যতে শুধু ডেঙ্গু নয়, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশা, পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি একদিন বিশ্বব্যাপী মশা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে উঠবে।

মশা সাধারণ একটি কীটপতঙ্গ হলেও এর কারণে সারা বিশ্বে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া এবং জিকা ভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মূলত দায়ী মশা। তাই মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা নানা ধরনের গবেষণা চালিয়ে আসছেন। এবার সেই গবেষণায় যুক্ত হয়েছে এক অভিনব পদ্ধতি, যেখানে মশাকেই ব্যবহার করা হবে মশার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে।

বিশ্বজুড়ে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকায় নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের খোঁজ করছেন গবেষকরা। সেই লক্ষ্যেই একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় ৬ কোটি ৪০ লক্ষ বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছাড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগবাহী মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি হ্রাস করা।

মশা মানুষের জন্য শুধু বিরক্তির কারণ নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর রোগবাহক প্রাণী। স্ত্রী মশা মানুষের রক্ত পান করে এবং সেই সময় বিভিন্ন রোগজীবাণু এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া এবং আরও অনেক সংক্রামক রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মশার বংশবিস্তার দ্রুত ঘটে। ফলে অনেক দেশে মশাবাহিত রোগ এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, পুরুষ মশা মানুষের রক্ত পান করে না। তারা মূলত ফুল ও গাছের রস থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। এই বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরনের পুরুষ মশা।

গবেষণাগারে উৎপাদিত এসব পুরুষ মশার শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে ‘ওলবাচিয়া পিপিয়েন্তিস’ নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিক পরিবেশে স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

যখন ব্যাকটেরিয়াবাহী পুরুষ মশা কোনো বন্য স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন স্ত্রী মশার প্রজনন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে ডিম উৎপাদন করতে পারে না অথবা উৎপাদিত ডিম থেকে নতুন মশা জন্মায় না।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ওলবাচিয়া একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া, যা পৃথিবীর বহু ধরনের পোকামাকড়ের শরীরে আগে থেকেই পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এই ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন।

মশা নিয়ন্ত্রণে ওলবাচিয়া ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি রাসায়নিক কীটনাশকের মতো পরিবেশ দূষণ ঘটায় না। একই সঙ্গে মানুষের জন্যও এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি মশা ধ্বংস না করে তাদের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মশার সংখ্যা কমানোর একটি টেকসই উপায় তৈরি হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় গবেষণাগারে ইতোমধ্যে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ বিশেষ পুরুষ মশা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ধাপে ধাপে এসব মশা ছেড়ে দিয়ে রোগবাহী মশার জনসংখ্যা কমিয়ে আনা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি সফল হলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের Florida এবং California অঞ্চলে এই মশা ছাড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে একসঙ্গে সব মশা ছাড়া হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় দুই বছরের সময়সীমার মধ্যে ধাপে ধাপে এসব পুরুষ মশা পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে। এর ফলে গবেষকরা প্রতিটি ধাপের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারবেন।

যদিও গবেষণাগারে মশা প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তবুও প্রকৃতিতে ছাড়ার আগে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতির আবেদন ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদন মিললে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করবে এবং গবেষকরা মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা যাচাই করতে পারবেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে ওলবাচিয়া প্রযুক্তিভিত্তিক এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

যদি এই প্রকল্প সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে শুধু ডেঙ্গু নয়, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশা, পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি একদিন বিশ্বব্যাপী মশা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে উঠবে।

মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ৬ কোটিরও বেশি বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত পুরুষ মশা ছাড়ার পরিকল্পনা সেই প্রচেষ্টারই একটি যুগান্তকারী উদাহরণ। মশাকে ব্যবহার করে মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগ সফল হলে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য তা হতে পারে এক বড় অর্জন। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি ভবিষ্যতের একটি কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।