ফুটবলের জন্মভূমি হিসেবে ইংল্যান্ডের পরিচিতি বহু পুরোনো। আধুনিক ফুটবলের নিয়ম-কানুন প্রণয়ন, বিশ্বজুড়ে খেলাটির বিস্তার এবং ঐতিহাসিক অবদানের কারণে ইংলিশরা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বাস করে, বিশ্বকাপ একদিন আবার তাদের ঘরেই ফিরবে। সেই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে বিখ্যাত স্লোগান—“ইটস কামিং হোম”।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে বারবার ব্যর্থতার হতাশা সঙ্গী হয়েছে থ্রি লায়ন্সদের। প্রতিটি বিশ্বকাপের আগে সমর্থক ও গণমাধ্যমের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হলেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা অধরাই থেকে গেছে।
বিশ্বখ্যাত ফুটবল লেখক সাইমন কুপার এবং ফুটবল অর্থনীতিবিদ স্টিফান সিজমানস্কি তাদের আলোচিত গবেষণাধর্মী বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন কেন ইংল্যান্ড ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর দেশ হয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারে না।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেবল ঐতিহ্য বা ধনী লিগ থাকলেই সফলতা আসে না। আধুনিক চিন্তাভাবনা, উদার মানসিকতা এবং কৌশলগত অভিযোজন ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ইংলিশ ফুটবলে যে আত্মতুষ্টি ও অহমিকাপূর্ণ সংস্কৃতি ছিল, সেটিই অনেক সময় আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংল্যান্ডের ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ক্রিকেটে যেমন আক্রমণাত্মক ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করে দলটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ফুটবলেও একই ধরনের বিপ্লব আনার চেষ্টা চলছে।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণে এবার ইংল্যান্ড ভরসা করছে জার্মান কোচ টমাস টুখেলের ওপর। ইউরোপের অন্যতম সেরা কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত টুখেল ইতোমধ্যেই দল নির্বাচন ও খেলার ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, তিনি বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় তারকাকে দলে রাখেননি। চেলসির কোল পালমার, ম্যানচেস্টার সিটির ফিল ফোডেন, রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড এবং অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার হ্যারি ম্যাগুয়ারের মতো খেলোয়াড়দের বাদ দেওয়া অনেককে বিস্মিত করেছে।
টুখেলের দর্শন স্পষ্ট—নাম নয়, দলের ভারসাম্য ও কৌশলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন ইংল্যান্ড স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে। দলে আছেন হ্যারি কেইন, ডেকলান রাইস, জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, মার্কাস রাশফোর্ড, অলি ওয়াটকিন্স, মরগ্যান রজার্স এবং কোবি মাইনুর মতো তারকারা।
এছাড়া ইভান টনি, ননি মাদুকে, জ্যারেল কোয়ানসাহ এবং জেড স্পেন্সের মতো খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি টুখেলের সাহসী সিদ্ধান্তের উদাহরণ।
বিশেষ করে ডেকলান রাইসকে কেন্দ্র করেই নতুন ইংল্যান্ডের মধ্যমাঠ গড়ে উঠতে পারে। আর্সেনালের হয়ে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স ইতোমধ্যেই তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে।
কাগজে-কলমে ইংল্যান্ড ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেললেও বাস্তবে টুখেলের পরিকল্পনা অনেক বেশি জটিল ও গতিশীল।
বল নিজেদের দখলে থাকলে ফরমেশন দ্রুত ৩-২-৫ রূপ নেয়। তখন একজন ফুলব্যাক মাঝমাঠে উঠে আসেন এবং সামনের সারিতে পাঁচজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
এর ফলে:
- মাঠের গুরুত্বপূর্ণ জোনগুলোতে সংখ্যাগত আধিপত্য তৈরি হয়
- প্রতিপক্ষের জন্য বল বের করা কঠিন হয়ে পড়ে
- আক্রমণে বাড়তি বিকল্প পাওয়া যায়
- বল হারালেও দ্রুত রক্ষণে ফেরা সম্ভব হয়
আধুনিক ইউরোপিয়ান ফুটবলে এই ধরনের কৌশল অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
টুখেলের পরিকল্পনায় ডেকলান রাইস ও এলিয়ট অ্যান্ডারসনের জুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্ডারসন মূলত রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ডিফেন্সের সামনে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেবেন এবং বল পুনরুদ্ধারের কাজ করবেন।
অন্যদিকে রাইসকে আরও স্বাধীন ভূমিকা দেওয়া হবে। তিনি আক্রমণে উঠে গিয়ে সুযোগ তৈরি করবেন এবং প্রয়োজন হলে গোলের কাছাকাছি অবস্থান নেবেন।
এই সমন্বয় ইংল্যান্ডকে একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করবে।
আগের কোচিং সেটআপে জুড বেলিংহামকে সবসময় তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
টুখেলের অধীনে তিনি হবেন মিডফিল্ড ও আক্রমণভাগের সংযোগসূত্র। হ্যারি কেইনের সঙ্গে তার সমন্বয় ইংল্যান্ডের আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হতে পারে।
ফোডেন ও পালমারের অনুপস্থিতি বেলিংহামকে আরও বেশি স্বাধীনতা দেবে। ফলে তিনি নিজের সৃজনশীলতা ও আক্রমণাত্মক দক্ষতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।
হ্যারি কেইন শুধু গোলদাতা নন, তিনি দলের নেতৃত্বেরও মূল কেন্দ্রবিন্দু।
টুখেলের পরিকল্পনায় কেইন প্রায়ই নিচে নেমে এসে খেলা তৈরি করবেন। এতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তার পেছনে ছুটতে বাধ্য হবে এবং সামনে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় সাকা, গর্ডন বা রাশফোর্ডদের মতো দ্রুতগতির খেলোয়াড়রা আক্রমণ চালাতে পারবেন।
এই কৌশল আধুনিক ফুটবলে অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বুকায়ো সাকা এবং এন্থনি গর্ডন এই সিস্টেমে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করবেন।
আক্রমণের সময় তারা উইঙ্গার হিসেবে খেলবেন, আবার বল হারালে দ্রুত নিচে নেমে রক্ষণেও সাহায্য করবেন।
অন্যদিকে তরুণ নিকো ও’রেইলি ইংল্যান্ডের দীর্ঘদিনের লেফটব্যাক সংকট দূর করার সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। বল দখলে তার স্বাচ্ছন্দ্য এবং মিডফিল্ডে খেলার সক্ষমতা টুখেলের কৌশলের সঙ্গে দারুণভাবে মানানসই।
ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো তাদের রক্ষণ।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দলটি টানা আটটি ম্যাচ জিতেছে কোনো গোল না খেয়ে। তবে এটি রক্ষণাত্মক ফুটবলের ফল নয়।
বরং সংগঠিত প্রেসিং, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার এবং প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখার মাধ্যমে এই সাফল্য এসেছে।
রাইস ও অ্যান্ডারসন মাঝমাঠে চাপ তৈরি করেন, আর ডিফেন্ডাররা পিছনে শক্ত দেয়াল গড়ে তোলেন।
আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রথম একাদশ নয়, পুরো স্কোয়াডের গভীরতাও গুরুত্বপূর্ণ।
অলি ওয়াটকিন্স, ইভান টনি, এবেরেচি এজে এবং মরগ্যান রজার্সের মতো খেলোয়াড়রা বেঞ্চ থেকে নেমেও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
বিশেষ করে নকআউট ম্যাচে ক্লান্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই বিকল্পগুলো ইংল্যান্ডকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া, ঘানা এবং পানামা।
ক্রোয়েশিয়া এখনও অভিজ্ঞ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ দল। যদিও লুকা মদ্রিচের বয়স ৪০ ছুঁয়েছে এবং বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ইনজুরির সমস্যায় রয়েছেন, তবুও তাদের অভিজ্ঞতা বিপজ্জনক হতে পারে।
ঘানার দলে রয়েছে বেশ কয়েকজন প্রিমিয়ার লিগ অভিজ্ঞ ফুটবলার। ফলে আফ্রিকার প্রতিনিধিরাও কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে পানামার বিপক্ষে ইংল্যান্ডকে ফেভারিট ধরা হচ্ছে।
ইংল্যান্ডের বর্তমান দলটিতে প্রতিভা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং তারুণ্যের দুর্দান্ত সমন্বয় রয়েছে। টমাস টুখেল অতীতের ভুলগুলো সংশোধন করে একটি সুসংগঠিত, কৌশলগত এবং আধুনিক দল গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
অবশ্যই শুধু কাগজে-কলমে শক্তিশালী দল হলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। বড় মঞ্চে চাপ সামলানো, দলীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সমান জরুরি।
তবুও দীর্ঘদিন পর ইংল্যান্ডকে ঘিরে বাস্তবসম্মত আশাবাদ তৈরি হয়েছে। টুখেলের পরিকল্পনা যদি মাঠে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি সত্যিই হয়তো আবার ইংল্যান্ডের ঘরে ফিরতে পারে।

