বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন বিতর্ক: আলোচনায় স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, আবেগ এবং বিতর্কের মিশেল। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেফারিরাও। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ।
শনিবার ভারতীয় সময় গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে দায়িত্ব পালন করবেন ৪৬ বছর বয়সী এই রেফারি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর অতীতের একটি বিতর্কিত ঘটনা আবারও সামনে চলে এসেছে। ফলে ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
ওমর আরতানকে ঘিরে বিতর্কের রেশ কাটেনি
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আরেকটি রেফারি বিতর্ক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ হারান। আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি হিসেবে পরিচিত হলেও মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে এই আসর থেকে দূরে থাকতে হয়েছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন স্লাভকো ভিনচিচ। প্রশ্ন উঠেছে, একজন রেফারিকে নাগরিকত্বের কারণে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে, অতীতে গুরুতর অভিযোগে নাম জড়ানো আরেক রেফারি কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান?
কে এই স্লাভকো ভিনচিচ?
স্লাভকো ভিনচিচ ইউরোপীয় ফুটবলের পরিচিত মুখ। গত কয়েক বছরে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল, ইউরোপা লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচসহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট।
ফিফা এবং উয়েফার তালিকাভুক্ত এলিট রেফারিদের একজন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। মাঠে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চাপ সামলানোর দক্ষতার জন্যও পরিচিত স্লোভেনিয়ার এই রেফারি।
তবে তাঁর পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কিত অতীতও বারবার আলোচনায় উঠে আসে।
২০২০ সালের বিতর্ক: কেন আটক করা হয়েছিল ভিনচিচকে?
২০২০ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার একটি খামারবাড়িতে পুলিশের বিশেষ অভিযানের সময় স্লাভকো ভিনচিচকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়।
পুলিশি অভিযানে মোট ২৬ জন পুরুষ ও ৯ জন নারীকে আটক করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, দেহব্যবসা, মাদক পাচার এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
সেই তালিকায় নাম ছিল স্লাভকো ভিনচিচেরও। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ইউরোপীয় ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, মুক্তি পান ভিনচিচ
তবে তদন্তের পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। স্লাভকো ভিনচিচকে পরবর্তীতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি নেওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ।
অর্থাৎ, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হননি। তবুও এমন একটি ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সমালোচনা পিছু ছাড়েনি।
ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের মতে, এমন বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা একজন কর্মকর্তার বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন তাঁকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করেছে, তখন তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
ঘটনার ব্যাখ্যায় কী বলেছিলেন ভিনচিচ?
বিতর্কের পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন স্লাভকো ভিনচিচ। তিনি দাবি করেন, ব্যবসায়িক কাজে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে এক পরিচিত ব্যক্তির আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিতে ওই খামারবাড়িতে উপস্থিত হন।
ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ওই স্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ভুল। কারণ তিনি জানতেন না সেখানে কী ধরনের কার্যকলাপ চলছিল।
ভিনচিচের ভাষায়, “আমি ব্যবসায়িক সফরে সেখানে গিয়েছিলাম। পরিচিত একজনের আমন্ত্রণে ওই স্থানে যাই। পরে বুঝতে পারি এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি।”
বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
স্লাভকো ভিনচিচের অতীতকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক এবং সমর্থক। তাঁদের মতে, ওমর আরতানের মতো একজন যোগ্য রেফারি প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারলেও, বিতর্কিত অতীত থাকা একজন রেফারিকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ব্রাজিলের মতো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী দলের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব ভিনচিচের হাতে তুলে দেওয়াকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে রেফারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কি একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে?
ফিফার অবস্থান কী?
এ পর্যন্ত ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে স্লাভকো ভিনচিচকে নিয়ে চলমান বিতর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি এবং তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তাই সংস্থাটি তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কোনো বাধা দেখেনি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া কঠিন। তবে বিশ্বকাপের মতো আসরে কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ও জনআস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিতর্কের মধ্যেই মাঠে নামবেন ভিনচিচ
সব বিতর্ক এবং সমালোচনাকে পেছনে ফেলে ব্রাজিল ও মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন স্লাভকো ভিনচিচ। ম্যাচ চলাকালীন তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাড়তি নজরে থাকবে বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি এবার নজর থাকবে রেফারির দিকেও। অতীতের বিতর্ক ছাপিয়ে তিনি কি নিরপেক্ষ ও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
স্লাভকো ভিনচিচকে ঘিরে বিতর্ক ফুটবল বিশ্বে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ আসরে তাঁর উপস্থিতি আবারও পুরোনো প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি নির্দোষ হলেও জনমতের আদালতে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।
অন্যদিকে ওমর আরতানের মতো রেফারির বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক ফুটবলে সমতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে, মাঠের বাইরের এই বিতর্ক বিশ্বকাপের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

