বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। ফাইনালে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পরাজয়ের পর মাঠে মেসির নীরব বিদায়, চোখের জল এবং সাংবাদিকদের সামনে না আসা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর আবেগঘন মুহূর্ত। এর মধ্যেই আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের একটি আবেগমাখা সামাজিকমাধ্যম পোস্ট নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তাহলে কি সত্যিই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে চলেছেন লিওনেল মেসি?
যদিও এখনও পর্যন্ত মেসি নিজে অবসরের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, তবু তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে সমর্থকদের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ মনে করছেন, ফেডারেশনের পোস্টে এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে যা ভবিষ্যতের বড় সিদ্ধান্তের আভাস দিতে পারে।
ফাইনালে প্রত্যাশামতো পারফর্ম করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের দাপটে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায় দল। অধিনায়ক হিসেবে লিওনেল মেসিও নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না। শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা যায়, মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর চোখের জল। সাধারণত বড় ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেও এবার সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত হননি মেসি। কোনও বক্তব্যও দেননি। তাঁর এই নীরবতাই অবসর নিয়ে জল্পনাকে আরও জোরালো করে তোলে।
ফাইনালের পর সামাজিকমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। সেখানে রানার্স-আপের পদক গলায় ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মেসি। তাঁর চোখে স্পষ্ট হতাশা এবং আবেগের ছাপ।
ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়—
“অধিনায়ক, তোমার কান্না আমাদেরও কাঁদায়। তুমি আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আনন্দ উপহার দিয়েছ। দেশের জন্য তোমার নিষ্ঠা, তোমার জাদুকরী ফুটবল এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াইকে আমরা স্যালুট জানাই। তোমাকে আমরা সারাজীবন ভালোবাসব, লিও। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।”
এই বার্তাই সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেক সমর্থকের মতে, এমন ভাষা সাধারণত কোনও কিংবদন্তির বিদায়ের মুহূর্তেই ব্যবহার করা হয়। তাই অনেকে এটিকে মেসির সম্ভাব্য অবসরের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—মেসি কি সত্যিই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিতে চলেছেন?
এর উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। কারণ, মেসি নিজে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের কথা উল্লেখ করেনি।
ফলে পুরো বিষয়টি এখনো অনুমান এবং আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। তবে মেসির বয়স, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এবং সাম্প্রতিক আবেগঘন পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনেকেই মনে করছেন, বড় কোনও সিদ্ধান্ত সামনে আসতে পারে।
আর্জেন্টিনার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আরেকটি সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। জানা যাচ্ছে, দেশের মাটিতে মেসির সম্মানে একটি বিশেষ প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের চিন্তাভাবনা চলছে।
যদি এমন আয়োজন হয়, তাহলে সেই ম্যাচেই হাজারো সমর্থকের সামনে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাতে পারেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই কিংবদন্তি।
অবশ্য এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
ফাইনালের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ।
তিনি বলেন, “এখন ওর বয়স ৩৯ বছর। তবু ওর সামর্থ্য অবিশ্বাস্য। আমি ওর কাছ থেকে নতুন করে কিছু চাওয়ার অবস্থায় নেই। আগেও বলেছি, আজও বলছি—মেসি যতদিন খেলতে চাইবে, ততদিন খেলতে পারবে। সমর্থক, সতীর্থ এবং পুরো দেশ সবসময় ওর পাশে থাকবে। ও যা অর্জন করেছে, তাতে নিঃসন্দেহে সে বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার।”
কোচের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, দলের পক্ষ থেকে মেসির ওপর কোনও চাপ নেই। সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজের।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির অবদান কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিতিয়েছেন এবং বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা না জেতার কারণে সমালোচনার মুখে পড়লেও পরবর্তীতে তিনি সেই সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। তাঁর নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা একাধিক বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করেছে এবং কোটি কোটি সমর্থকের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
এই কারণেই মেসির সম্ভাব্য বিদায়ের খবর আবেগে ভাসাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকে।
সামাজিকমাধ্যমে হাজার হাজার সমর্থক মেসির পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ তাঁকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ করছেন, আবার কেউ তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।
অনেকেই লিখেছেন, মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তাঁর উপস্থিতি মাঠে থাকলে আর্জেন্টিনা সবসময় বাড়তি আত্মবিশ্বাস পায়। তাই তাঁর অবসর নিয়ে যে কোনও আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই কোটি ভক্তের আবেগকে নাড়া দেয়।
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে থাকলেও এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফাইনালের পর তাঁর আবেগঘন মুহূর্ত এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের হৃদয়স্পর্শী বার্তা নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা জানতে অপেক্ষা করতেই হবে।
এখন ফুটবলপ্রেমীদের নজর একটাই প্রশ্নে—লিওনেল মেসি কি সত্যিই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন, নাকি আরও কিছুদিন আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে মাঠ মাতাবেন? সেই উত্তর সময়ই দেবে।

