রাজধানী ঢাকার বায়ু ও শব্দ দূষণ কমাতে এবং নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিবেশ দূষণকারী যানবাহন দ্রুত রাজধানীর সড়ক থেকে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যানজট নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর আরও অন্তত ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইট স্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরিবেশ দূষণবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, যানবাহনের পরিবেশগত প্রভাব এবং নগর ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রাজধানীর রাস্তায় চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো ও অনুপযুক্ত যানবাহন শুধু সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবেও কাজ করে। তাই এসব যানবাহন অপসারণের মাধ্যমে নগরীর পরিবেশ ও জননিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যানজট নিরসন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে রাজধানীর আরও অন্তত ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অটোমেটিক ট্রাফিক লাইট সিস্টেম চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আরও দক্ষ হবে, সিগন্যাল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং যান চলাচলে গতি ফিরবে। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের ওপর চাপও অনেকাংশে কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বৈঠকে দেশের বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে ইটভাটার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইট উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেন, যাতে প্রচলিত দূষণকারী ইটভাটার পরিবর্তে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
রাজধানীতে অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহারের কারণে শব্দ দূষণ দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। বৈঠকে এ বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার রোধে আরও কঠোরভাবে আইন বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত এআই ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে হর্ন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে শব্দ দূষণ পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি কার্যকর হবে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে বায়ু ও শব্দ দূষণ কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবেশ দূষণবিষয়ক এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
সরকারের সর্বশেষ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকায় বায়ু ও শব্দ দূষণ কমানোর পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ, আধুনিক ট্রাফিক লাইট স্থাপন, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে রাজধানীকে আরও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকারের নতুন পদক্ষেপ হিসেবে এসব উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

