দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি। বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও টার্মিনালে বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে প্রায় ১০ হাজার নিলামযোগ্য কনটেইনার। এসব কনটেইনারে থাকা কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের আমদানি পণ্যের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে একদিকে যেমন মূল্যবান পণ্যের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল হয়ে থাকায় আমদানি-রফতানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন করা না গেলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল ও ইয়ার্ডে মোট ৯ হাজার ২৭৮টি নিলামযোগ্য কনটেইনার*পড়ে আছে। এসব কনটেইনারে প্রায় ২ লাখ টন আমদানি করা পণ্য সংরক্ষিত রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা।
বন্দর আইন অনুযায়ী, কোনো আমদানিকারক জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের ৩০ দিনের মধ্যে তা গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট পণ্য কাস্টমসের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি অথবা ধ্বংস করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নানা প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে থাকে।
ফলে নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলো বন্দরের জায়গা দখল করে পড়ে থাকে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের পণ্য নষ্ট হয়ে যায়।
কাস্টমস সূত্র জানায়, বিভিন্ন বাস্তব ও অর্থনৈতিক কারণে অনেক আমদানিকারক তাদের পণ্য খালাস নেননি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি,শুল্ক ও কর সংক্রান্ত জটিলতা,আর্থিক সংকট দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
এসব কারণে বহু কনটেইনার বছরের পর বছর বন্দরে পড়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ বছর আগের কনটেইনারও এখনও বন্দরে অবস্থান করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান ধারণক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করছে এসব অব্যবহৃত কনটেইনার। তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র নিলামের অপেক্ষায় থাকা কনটেইনারগুলোই বন্দরের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে।
এর ফলে নতুন আমদানি পণ্য দ্রুত খালাস ও সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর পর প্রয়োজনীয় জায়গা না থাকায় পুরো লজিস্টিক ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে।
শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক কনটেইনারও ধীরে ধীরে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এতে শিপিং কোম্পানি ও কনটেইনার মালিকরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
যদিও নিয়মিত নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, তবে এর গতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস প্রতি মাসে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি কনটেইনারের পণ্য বিক্রি করতে পারে। এসব নিলামে সাধারণত কমলা, মাল্টা, খেজুর, আদাসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য বিক্রি হয়। পাশাপাশি কিছু পণ্য ই-অকশনের মাধ্যমেও বিক্রি করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রায় ১০ হাজার কনটেইনারের বিপরীতে এই সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় জট কমছে না।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ৯ হাজার ২৭৮টি কনটেইনার নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৭০০টি ২০ ফুট কনটেইন ৬ হাজার ৫৭৮টি ৪০ ফুট কনটেইনার
অনেক কনটেইনারে থাকা পণ্য ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এসব পণ্য বিক্রি করলেও সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলো বন্দরের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যদি এসব কনটেইনার দ্রুত অপসারণ করা যায়, তাহলে বন্দরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জায়গা খালি হবে। সেই জায়গা নতুন আমদানি ও রফতানি পণ্য পরিচালনায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং বন্দরের কার্যক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে।
কাস্টমস সূত্র বলছে, বর্তমানে ২ হাজার ৬৯৭টি কনটেইনার নিলামের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অনুমোদন মিলেছে মাত্র ১ হাজার ৬১৯টির।
অন্যদিকে গত বছরে ৪৯৩টি এবং চলতি বছরে আরও ৪৯৫টি কনটেইনার নিলাম শেষে ক্রেতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অর্থাৎ দেড় বছরে মোট ৯৮৮টি কনটেইনার খালাস হলেও একই সময়ে নতুন করে আরও কয়েকশ কনটেইনার নিলামের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে জট কমার পরিবর্তে প্রায় একই অবস্থায় রয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, নিলাম কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয়। ফলে প্রতিটি ধাপ শেষ করতে সময় লাগে।
তার মতে, প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণেই নিলাম সম্পন্ন হতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে প্রশাসন নিলাম কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, বছরের পর বছর নিলাম সম্পন্ন না হওয়ায় কনটেইনারে থাকা বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, শুধু পণ্যের ক্ষতিই নয়, দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে কনটেইনারও ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। এতে শিপিং এজেন্টদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে তারা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারেও দ্রুত নিলাম কার্যক্রম শেষ করার দাবি জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। তাই এখানে দীর্ঘদিন ধরে কনটেইনার জট অব্যাহত থাকলে তার প্রভাব শুধু বন্দরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে, ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিলাম প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও দ্রুত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা অকার্যকর কনটেইনার দ্রুত অপসারণ করা গেলে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।

