খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খানকে কর্মস্থল থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। একটি বিতর্কিত বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার একদিনের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) তাকে অবিলম্বে পুলিশ সদর দফতরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ সদর দফতরের পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১ শাখা থেকে জারি করা এক আদেশে মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খানকে বর্তমান দায়িত্বভার যথাযথভাবে হস্তান্তর করে নির্ধারিত সময়ে সদর দফতরে যোগ দিতে বলা হয়েছে। আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত ওই আদেশ অনুযায়ী, তাকে রবিবার পুলিশ সদর দফতরে রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাশিদুল ইসলাম খান খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে প্রশাসন, অর্থ ও অপরাধ দমন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সম্প্রতি খুলনা নগরের লবণচরা থানার মহিরবাড়ি খালপাড় এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। সেখানে দেওয়া তার একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
প্রায় ২৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, কোনো দারোগা বা ইন্সপেক্টরকে তথ্য দেওয়ার পরও যদি গোপন তথ্য ফাঁস হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা পরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই মনে করেন, একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যে আরও সংযম ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা থাকা উচিত ছিল।
ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনও একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য ও কর্মকর্তার বক্তব্যে পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা জরুরি।
সংগঠনটি উল্লেখ করে, জনসম্মুখে দেওয়া বক্তব্য এমন হওয়া উচিত যা বাহিনীর মর্যাদা, শৃঙ্খলা এবং জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী করে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা ঘটলে তা প্রচলিত আইন, বিভাগীয় বিধি এবং সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়াই গ্রহণযোগ্য।
একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের মনোবল, পেশাগত নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরা হয়।
বিতর্কের পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সহায়তা ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, বক্তব্যের একটি অংশ কেটে আলাদাভাবে প্রচার করা হয়েছে, যার ফলে মূল বক্তব্যের অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে আশ্বস্ত করা যে, কেউ যদি গোপন তথ্য ফাঁস করে, তাহলে তাকে আইনি ও বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের আহ্বান জানাননি বলেও দাবি করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার মহিরবাড়ি খালপাড় এলাকায় ওই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। গত দুই বছরে খুলনায় একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের হাতে বহু হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে লবণচরা থানা এলাকায় অপরাধের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পুলিশ স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। অনেক বাসিন্দা ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে থানায় অভিযোগ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, পুলিশের একাধিক অভিযানের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় জনগণের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন এলাকায় মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

