বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন গতি আনতে প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম আন্তর্জাতিক সফর, যা শুরু হবে আগামী ২১ জুন মালয়েশিয়া দিয়ে। এরপর তিনি ছয় দিনের গুরুত্বপূর্ণ সফরের অংশ হিসেবে চীনে যাবেন। ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীনে অবস্থান করবেন তিনি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য বড় বার্তা বয়ে আনতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি কর্মী এই দেশটিতে কাজের সুযোগ পেয়ে থাকেন। তবে নানা জটিলতায় এই শ্রমবাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হচ্ছে এই বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, সফরকালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি নোট অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তিগুলো বাস্তবায়িত হলে মালয়েশিয়ায় নতুন করে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শুধু নতুন শ্রমবাজার খোলা নয়, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়মিত করার বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে। এটি হাজারো প্রবাসী পরিবারের জন্য স্বস্তির খবর হতে পারে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বড় অগ্রগতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই বাজার চালু হলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মালয়েশিয়া সফরে শুধু শ্রমবাজার নয়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও বড় আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের হালাল পণ্য রফতানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্ববাজারে হালাল খাদ্য ও প্রসাধনীর বাজার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর নতুন পথ খুলতে পারে।
মালয়েশিয়া সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী চীনের উদ্দেশে রওনা দেবেন। এই সফরকে আরও বেশি কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার।
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হতে পারে।
বাংলাদেশ চায় চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ুক। বিশেষ করে শিল্প কারখানা স্থানান্তর, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু এবং উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর প্রতিনিধিরাও সফরসঙ্গী থাকবেন, যা এই সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন করলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
সফরের আলোচনায় মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন বড় বিষয় হিসেবে থাকছে। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পেও চীনের অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অবকাঠামো খাতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চীন সফরের সময় নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল স্থাপনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীন এই প্রকল্পে অনুদানের মাধ্যমে অর্থায়ন করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী ২৩ জুন দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন তিনি।
এছাড়া আরসিইপি, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার বিষয়েও চীনের সমর্থন চাইবে ঢাকা।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
এতে বোঝা যাচ্ছে, এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি বড় উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা—দুই দিক থেকেই এই সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে প্রবাসী আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে বড় বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের পথও উন্মুক্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বিদেশ সফর বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।

