খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeআবহাওয়াবর্ষা এসেছে, বৃষ্টি নেই! আকাশে মেঘ উধাও—পশ্চিমা বায়ুই কি আসল ভিলেন?

বর্ষা এসেছে, বৃষ্টি নেই! আকাশে মেঘ উধাও—পশ্চিমা বায়ুই কি আসল ভিলেন?

পূর্বমুখী বায়ুপ্রবাহ এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে চালায়। এটা ঠিকমতো কাজ করলে মেঘ জমে, আর বৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন এই প্রবাহে বাধা পড়ে, তখন মেঘ তৈরি হয় না—ফলে বৃষ্টিও হয় না।

বর্ষা মানেই আমাদের মনে একটা পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে—কালো মেঘে ঢেকে থাকা আকাশ, হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি, আর চারপাশে এক ধরনের শীতলতা। কিন্তু এ বছর সেই ছবিটা যেন উল্টে গেছে। খাতায়-কলমে বর্ষা এসে গেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে বৃষ্টির দেখা নেই বললেই চলে। উল্টে গরম আর অস্বস্তি যেন আরও বেড়ে গেছে।

এই অদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে এখন আবহাওয়াবিদদের মধ্যে বেশ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্র দেখে তারা আরও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কারণ, যেখানে বর্ষার সময় আকাশ ভরে থাকার কথা ঘন মেঘে, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রায় পরিষ্কার আকাশ।

বর্ষা আছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই—অদ্ভুত এই পরিস্থিতি

দেশের মধ্য, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্ষা ঢুকে পড়েছে বলে সরকারি রিপোর্টে উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সাধারণত ৪ জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সময়ে গড়ে প্রায় ৫৩.৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা। কিন্তু এবার সেই সময়ে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৯.২ মিলিমিটার। মানে প্রায় ৬৪ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি!

একটু সহজভাবে বলি—ধরো তুমি প্রতিদিন এক গ্লাস পানি খাওয়ার কথা, কিন্তু কয়েকদিন ধরে অর্ধেক গ্লাসও পাচ্ছো না। শরীর যেমন অস্বস্তিতে পড়ে, ঠিক তেমনই প্রকৃতিও এখন অস্বস্তিতে আছে।

উপগ্রহ চিত্রে যা দেখা গেল

১৫ জুনের উপগ্রহ চিত্রে যে দৃশ্য ধরা পড়েছে, তা সত্যিই চিন্তার। বর্ষার সময় সাধারণত আকাশে ঘন মেঘের স্তর দেখা যায়। কিন্তু এবার অধিকাংশ জায়গায় আকাশ একেবারে পরিষ্কার।

শুধুমাত্র উত্তর-পূর্ব ভারত, হিমালয়ের পাদদেশ এবং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে কিছু মেঘ জমতে দেখা গেছে। বাকি জায়গাগুলোতে মেঘের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।

এটা অনেকটা এমন—মেঘ আছে কোথাও কোথাও, কিন্তু মূল জায়গাগুলো যেন ফাঁকা পড়ে আছে।

জলীয় বাষ্প আছে, তবুও বৃষ্টি হচ্ছে না কেন?

এখানেই আসল রহস্যটা লুকিয়ে আছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে যথেষ্ট জলীয় বাষ্প রয়েছে। মানে বৃষ্টি হওয়ার জন্য যে মূল উপাদান দরকার, সেটা আছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?

সমস্যা হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের একটু উপরের স্তরে—ভূপৃষ্ঠ থেকে কয়েক কিলোমিটার ওপরে।

মেঘের ‘ভিলেন’ হিসেবে পশ্চিমা বায়ু

এই পরিস্থিতির জন্য মূল দায়ী হিসেবে ধরা হচ্ছে পশ্চিমা বায়ুকে। সাধারণত এই বায়ু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে, কিন্তু এবার সেটা স্বাভাবিক অবস্থান থেকে অনেকটা দক্ষিণে সরে এসেছে।

এই সরে যাওয়াটাই পুরো খেলাটা বদলে দিয়েছে।

কারণ, এই পশ্চিমা বায়ু এখন পূর্বমুখী বায়ুপ্রবাহে বাধা দিচ্ছে। আর এই পূর্বমুখী বায়ুই হচ্ছে মৌসুমী বায়ুর মূল চালিকা শক্তি—যা মেঘ তৈরি করে এবং বৃষ্টি ঘটায়।

একটু সহজ করে বললে—ধরো তুমি একটা রাস্তা দিয়ে পানি আনছো, কিন্তু মাঝপথে কেউ একটা বড় দেয়াল তুলে দিল। তখন পানি আর সামনে যেতে পারবে না। ঠিক তেমনই পশ্চিমা বায়ু এখন সেই ‘দেয়াল’-এর কাজ করছে।

কেন এই বায়ুপ্রবাহ এত গুরুত্বপূর্ণ?

মৌসুমী বায়ু বা মনসুন আসলে একটা জটিল প্রক্রিয়া। এতে বিভিন্ন দিক থেকে বায়ু আসে, তাপমাত্রা পরিবর্তন হয়, আর সেই সব মিলিয়ে মেঘ তৈরি হয়।

পূর্বমুখী বায়ুপ্রবাহ এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে চালায়। এটা ঠিকমতো কাজ করলে মেঘ জমে, আর বৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন এই প্রবাহে বাধা পড়ে, তখন মেঘ তৈরি হয় না—ফলে বৃষ্টিও হয় না।

এবার সেটাই ঘটছে।

উত্তর-পূর্বে বৃষ্টি হচ্ছে কেন?

একটা মজার বিষয় হলো, দেশের উত্তর-পূর্ব অংশে কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে। কারণ ওই অঞ্চলে এই বায়ুপ্রবাহের প্রভাব তুলনামূলক কম।

হিমালয়ের পাদদেশে বায়ুর গতিপথ একটু আলাদা হয়। ফলে সেখানে মেঘ জমতে পারছে এবং বৃষ্টি হচ্ছে।

এটা অনেকটা এমন—একই শহরের একদিকে বৃষ্টি হচ্ছে, আরেকদিকে একফোঁটা নেই!

এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে?

এটা শুনে একটু স্বস্তি পেতে পারো—আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে পশ্চিমা বায়ুর শক্তি কমে আসতে পারে। তখন পূর্বমুখী বায়ু আবার সক্রিয় হবে। ফলে মেঘ তৈরি শুরু হবে এবং বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।

মানে এখনকার এই ‘বৃষ্টি-বিহীন বর্ষা’ হয়তো সাময়িক।

কৃষি ও সাধারণ জীবনে প্রভাব

এই ধরনের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে কৃষিতে। সময়মতো বৃষ্টি না হলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে।

এছাড়া শহরের জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। গরম বাড়ে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, আর মানুষের দৈনন্দিন কাজেও অস্বস্তি তৈরি হয়।

ভাবো তো, বর্ষার সময়েও যদি গরমে হাঁসফাঁস করতে হয়—কেমন লাগে!

শেষ কথা

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটু অস্বাভাবিক হলেও একেবারে ভয় পাওয়ার মতো নয়। প্রকৃতি মাঝে মাঝে এমন আচরণ করেই থাকে।

তবে এই ঘটনাটা আমাদের একটা বিষয় মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির ভারসাম্য কতটা সূক্ষ্ম। একটু এদিক-ওদিক হলেই পুরো চিত্র বদলে যায়।

এখন সবার চোখ আকাশে—কখন সেই পরিচিত কালো মেঘ ফিরে আসে, আর শুরু হয় টিপটিপ বৃষ্টি।