Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজএল নিনো ২০২৬: কেন দুর্বল ভারতের প্রাকৃতিক ‘রক্ষাকবচ’ এবং কতটা ঝুঁকিতে বর্ষা...

এল নিনো ২০২৬: কেন দুর্বল ভারতের প্রাকৃতিক ‘রক্ষাকবচ’ এবং কতটা ঝুঁকিতে বর্ষা ও কৃষি?

ধরো, ভারত মহাসাগরের পশ্চিম দিক (আফ্রিকার পাশে) যদি বেশি গরম হয় আর পূর্ব দিক (ইন্দোনেশিয়ার পাশে) ঠান্ডা থাকে—তাহলে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়। এই তাপমাত্রার পার্থক্য আর্দ্র বাতাসকে ভারতের দিকে টেনে আনে।

ভারতের বর্ষা মানেই জীবনের ছন্দ। গরমে পুড়ে যাওয়া মাটিতে যখন প্রথম বৃষ্টি নামে, তখন শুধু আবহাওয়া না—পুরো অর্থনীতি যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু সব বছর একরকম হয় না। বিশেষ করে যখন “এল নিনো” নামে একটা অদ্ভুত সমুদ্র-ঘটনা সক্রিয় হয়, তখন পুরো ছবিটাই বদলে যেতে পারে।

২০২৬ সালে ঠিক সেই চিন্তাটাই বড় হয়ে সামনে এসেছে। কারণ এই বছর এল নিনো শক্তিশালী, আর ভারতের নিজের প্রাকৃতিক সুরক্ষা—ভারত মহাসাগরের ডাইপোল—দুর্বল অবস্থায় আছে। সহজ ভাষায় বললে, যে বন্ধুটি সাধারণত বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায়, সে এবার তেমনভাবে সাহায্য করতে পারছে না।

চল, বিষয়টা ধীরে ধীরে সহজ করে বুঝি।

বর্ষা কীভাবে কাজ করে: ভারতের জীবনরেখা

প্রতি বছর গ্রীষ্মে সূর্যের তাপে ভারতীয় উপমহাদেশ খুব গরম হয়ে যায়। তখন সমুদ্রের তুলনায় স্থলভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হয়। এই তাপের কারণে ভারত মহাসাগর থেকে ঠান্ডা ও আর্দ্র বাতাস স্থলের দিকে ছুটে আসে। এটাকেই আমরা বলি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা।

এই বাতাস পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মেঘ তৈরি করে এবং বৃষ্টি ঝরায়। পুরো দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃষ্টি এই মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভর করে।

একটা ছোট উদাহরণ ধরো—তুমি যদি কৃষক হও, তোমার ধান বা ডালের ফসল পুরোপুরি এই বৃষ্টির ওপর নির্ভর করবে। বৃষ্টি কম মানেই ফলন কম, আর সেটার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে, দামে, এমনকি দেশের অর্থনীতিতে।

এল নিনো কী: প্রশান্ত মহাসাগরের অদ্ভুত খেলা

এখন আসি এল নিনোতে।

সাধারণভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে বাতাস পূর্ব থেকে পশ্চিমে বইতে থাকে, আর সেই বাতাস উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু কিছু বছর পরপর এই বাতাস দুর্বল হয়ে যায়।

তখন উষ্ণ জল উল্টো দিকে—অর্থাৎ পূর্ব দিকে, দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে ফিরে আসে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি অংশ হঠাৎ করেই বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকেই বলা হয় “এল নিনো”।

শুনতে সাধারণ লাগলেও এর প্রভাব কিন্তু বিশাল। এটা পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ার প্যাটার্ন বদলে দিতে পারে।

এল নিনো কীভাবে বর্ষায় বাধা দেয়

এখন মূল সমস্যাটা এখানেই।

ভারতে ভালো বৃষ্টির জন্য দরকার আর্দ্র বাতাস আর মেঘ তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ। কিন্তু এল নিনো এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে ঘেঁটে দেয়।

যে উষ্ণ বাতাসগুলো সাধারণত ভারতের দিকে উঠে এসে মেঘ তৈরি করে, এল নিনো সেই শক্তিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরিয়ে দেয়। ফলে ভারতের দিকে আর্দ্রতা কম আসে, মেঘ কম তৈরি হয়, আর বৃষ্টিও কমে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৫১ থেকে ২০২২—এই সময়ের প্রায় ৬০ শতাংশ এল নিনো বছরে ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে।

মানে ব্যাপারটা শুধু তত্ত্ব না, বাস্তবেও বারবার ঘটেছে।

ভারতের ‘রক্ষাকবচ’: ভারত মহাসাগরের ডাইপোল (IOD)

তবে সব বছর এল নিনো জিততে পারে না। অনেক সময় ভারতকে বাঁচায় নিজেরই এক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা—যাকে বলে ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (IOD)।

এটা একটু মজার ব্যাপার।

ধরো, ভারত মহাসাগরের পশ্চিম দিক (আফ্রিকার পাশে) যদি বেশি গরম হয় আর পূর্ব দিক (ইন্দোনেশিয়ার পাশে) ঠান্ডা থাকে—তাহলে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়। এই তাপমাত্রার পার্থক্য আর্দ্র বাতাসকে ভারতের দিকে টেনে আনে।

ফলে, এল নিনো থাকলেও বর্ষা খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

এটা ঠিক যেন ক্রিকেট ম্যাচে একটা দল খারাপ খেললেও অন্য একজন খেলোয়াড় এসে ম্যাচ বাঁচিয়ে দেয়!

২০২৬ সালে কেন সমস্যা বেশি

এই বছর আসল চিন্তা এখানেই।

২০২৬ সালে এল নিনো যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু যে IOD সাধারণত এটাকে ঠেকায়, সেটা এখন দুর্বল অবস্থায়।

তথ্য অনুযায়ী, IOD সূচক প্রায় -০.৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আছে, যা খুব ভালো সংকেত নয়। বেশিরভাগ আবহাওয়া মডেল বলছে, এটা দীর্ঘ সময় নিরপেক্ষ থাকতে পারে।

মানে কী?

মানে, এল নিনোকে থামানোর মতো শক্তিশালী কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ এবার তৈরি হচ্ছে না।

সম্ভাব্য প্রভাব: কৃষি ও অর্থনীতির উপর চাপ

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এর প্রভাব কী হতে পারে?

প্রথমেই আসি কৃষিতে।

ধান, ডাল, তুলা—এই ধরনের খারিফ ফসল বর্ষার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে এই ফসলগুলো দানা তৈরি করে, যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

যদি এই সময় বৃষ্টি কম হয়, তাহলে ফসলের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

ভাবো, একজন কৃষক সারা বছর পরিশ্রম করল, বীজ বপন করল, যত্ন নিল—আর শেষ মুহূর্তে বৃষ্টি না হওয়ায় সব নষ্ট হয়ে গেল। এটা শুধু একজনের ক্ষতি না, পুরো দেশের খাদ্য সরবরাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরার ঝুঁকি

এল নিনো সাধারণত তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

২০২৬ সালে জুন থেকেই গরম বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জুলাই-আগস্টেও বৃষ্টি কম হলে মাটি শুকিয়ে যাবে, খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এটা শহরেও প্রভাব ফেলবে—জলসংকট, বিদ্যুতের চাপ, এমনকি স্বাস্থ্যের সমস্যাও বাড়তে পারে।

আগের অভিজ্ঞতা: ২০০২ ও ২০১৫

আগে এমন ঘটনা হয়েছে।

২০০২ এবং ২০১৫ সালে শক্তিশালী এল নিনোর কারণে ভারতে মারাত্মক বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল, আর অর্থনীতিতেও চাপ পড়েছিল।

এই অভিজ্ঞতাই এখন সবাইকে চিন্তায় ফেলছে—২০২৬ কি আবার সেই পথেই যাচ্ছে?

ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা

এই পরিস্থিতি আমাদের একটা বড় শিক্ষা দেয়।

আমরা এখনো অনেকটাই প্রাকৃতিক বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

তাই ভবিষ্যতে আমাদের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে—

সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন
জল সংরক্ষণ
খরা সহনশীল ফসল
আর আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি

শেষ কথা

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এল নিনো শুধু একটা আবহাওয়ার ঘটনা না—এটা ভারতের কৃষি, অর্থনীতি আর সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, এই বছর ভারতের প্রাকৃতিক ‘রক্ষাকবচ’ তেমনভাবে কাজ করছে না।

তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই—আগাম প্রস্তুতি নিলে অনেক ক্ষতি কমানো সম্ভব।

একটা কথা মনে রাখো, প্রকৃতি সবসময় নিজের নিয়মে চলে। কিন্তু আমরা যদি একটু বুদ্ধি করে চলি, তাহলে সেই প্রভাবকে অনেকটাই সামলে নিতে পারি।