ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উত্তেজনা আর ইতিহাস গড়ার লড়াই। আর এই মঞ্চে আর্জেন্টিনা মানেই একটাই নাম সবার আগে চলে আসে—লিয়োনেল মেসি। গত বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর এবার নতুন লক্ষ্য, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া। কিন্তু সেই পথ মোটেও সহজ নয়। শক্তি যেমন আছে, তেমনি কিছু স্পষ্ট দুর্বলতাও রয়েছে। সব মিলিয়ে এক জটিল কিন্তু রোমাঞ্চকর সমীকরণ নিয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা।
গতবার আর্জেন্টিনা ছিল চ্যালেঞ্জার। এবার তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। এই পার্থক্যটাই সবকিছু বদলে দিয়েছে। এখন আর তারা আন্ডারডগ নয়, বরং সবাই তাদের হারাতে চাইবে। খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ অনেক বেশি থাকবে। প্রতিটি ম্যাচে তাদের থেকে সেরাটা আশা করবে সমর্থকরা।
কোচ লিওনেল স্কালোনি তাই দল গঠনে সময় নিয়েছেন। শেষ মুহূর্তে ২৬ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—এই দল তৈরি হয়েছে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে। অভিজ্ঞতা আর তরুণ শক্তির সুন্দর মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে দলে।
আর্জেন্টিনার আসল শক্তি তাদের মিডফিল্ড। কারণ ফুটবলে মাঝমাঠই খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে স্কালোনির হাতে আছে একাধিক অপশন।
এঞ্জো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পল—এরা যেমন আক্রমণ তৈরি করতে পারে, তেমনি প্রয়োজনে রক্ষণেও সাহায্য করে। আবার লিয়োনার্দো পারেদেসের মতো খেলোয়াড় রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করে।
নতুন প্রজন্ম থেকেও এসেছে সম্ভাবনাময় কিছু নাম, যেমন ভ্যালেন্টিন বার্কো বা লো সেলসো। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী কোচ সহজেই কৌশল বদলাতে পারবেন।
গোলরক্ষক হিসেবে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এক কথায় অসাধারণ। গত বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে টাইব্রেকারে তার ঠাণ্ডা মাথা আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেয়।
চাপের মুহূর্তে তিনি যেভাবে নিজেকে সামলান, সেটা পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তাই তাকে বলা যায় দলের নীরব নায়ক।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে রয়েছে ভয়ঙ্কর শক্তি। মেসি তো আছেনই, সঙ্গে ইউলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ।
মেসি এমন জায়গা থেকে গোল করতে পারেন, যেটা অন্যরা কল্পনাও করতে পারে না। আলভারেজ গত বিশ্বকাপে নিজের দক্ষতা দেখিয়েছে, আর লাউতারো ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন।
এই তিনজন একসাথে থাকলে যেকোনো ডিফেন্স ভেঙে ফেলা সম্ভব।
এখানেই আসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মেসির বয়স। প্রায় ৩৯ বছরে পুরো ম্যাচ জুড়ে একই গতিতে খেলা সহজ নয়। প্রতি ম্যাচে ৯০ মিনিট খেলা তার জন্য কষ্টকর হতে পারে।
আরেকটা বড় সমস্যা হলো, দল অনেক সময় অতিরিক্তভাবে মেসির ওপর নির্ভর করে। অনেক খেলোয়াড় ভাবেন, বলটা মেসিকে দিলেই কাজ শেষ। কিন্তু যদি প্রতিপক্ষ তাকে আটকে রাখে, তখন পুরো আক্রমণ থেমে যেতে পারে।
অর্থাৎ মেসিই যেমন শক্তি, তেমনি এক ধরনের দুর্বলতাও।
ডিফেন্স লাইনে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নিকোলাস ওটামেন্ডির অভিজ্ঞতা থাকলেও বয়সের কারণে তার গতি কমেছে। তাই লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে।
ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, নাহুয়েল মোলিনা—এরা ভালো খেলোয়াড়, কিন্তু পুরো ডিফেন্স এখন একটা ট্রানজিশনের মধ্যে আছে। এই পরিবর্তনের সময়টাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিটি বিশ্বকাপেই নতুন কিছু তারকা জন্ম নেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। নিকোলাস পাজ, থিয়াগো আলমাডা বা সিমিয়োনের মতো তরুণরা সুযোগ পেলে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে।
ঠিক যেমন গতবার এঞ্জো ফার্নান্দেজ হঠাৎ করেই বিশ্বমঞ্চে উঠে এসেছিলেন।
চ্যাম্পিয়ন দলের একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস থাকে। তারা জানে চাপ কীভাবে সামলাতে হয়। বড় ম্যাচে ঠাণ্ডা মাথায় খেলার অভিজ্ঞতা আর্জেন্টিনার বড় সম্পদ।
এই মানসিক শক্তি অনেক সময় টেকনিক বা ফিটনেসের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এবারের বিশ্বকাপ হবে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোয়। আর্জেন্টিনার অনেক খেলোয়াড় ইতিমধ্যেই উত্তর আমেরিকায় খেলে অভ্যস্ত।
তাই আবহাওয়া বা মাঠের পরিবেশ তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। এই ছোট সুবিধাটাও বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
একটা বড় চিন্তার জায়গা হলো ক্লান্তি। বিশ্বকাপের আগে সবাই ক্লাব ফুটবলে ব্যস্ত ছিল। ফলে শারীরিক ধকল থাকবে।
তার সঙ্গে যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো খেলোয়াড় চোট পায়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে। কারণ কিছু পজিশনে এখনও শক্ত বিকল্প তৈরি হয়নি।
আর্জেন্টিনার সমর্থকরা দারুণ আবেগপ্রবণ। তারা সবসময় দলের পাশে থাকে। কিন্তু এই ভালোবাসাই অনেক সময় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বকাপে মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে—সব জায়গায় আর্জেন্টিনার উপস্থিতি চোখে পড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনা এমন এক দল, যাদের জেতার সামর্থ্য আছে। কিন্তু সেই পথটা সহজ নয়। মেসির ম্যাজিক, দলের ভারসাম্য, আর কোচের কৌশল—সবকিছু ঠিকঠাক হলে তারা আবারও ইতিহাস গড়তে পারে।
কিন্তু ফুটবল তো সবসময় চমকের খেলা। তাই শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটা জানতে আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।
একটা কথা নিশ্চিত—মেসি মাঠে থাকলে অসম্ভবও সম্ভব মনে হয়। আর সেই আশাতেই বুক বাঁধছে কোটি ভক্ত।

