খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালদেশজুড়েবেনজীর আহমেদের সাভানা ইকো রিসোর্ট: বর্তমান অবস্থা, অনিয়মের ইতিহাস

বেনজীর আহমেদের সাভানা ইকো রিসোর্ট: বর্তমান অবস্থা, অনিয়মের ইতিহাস

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—এই রিসোর্ট শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি ক্ষমতা, অনিয়ম এবং মানুষের জীবনের বাস্তব গল্পের একটি বড় উদাহরণ।

গোপালগঞ্জের এক সময়ের আলোচিত বিনোদনকেন্দ্র সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। যেখানে একসময় মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসত, সেখানে এখন নীরবতা আর শূন্যতার ছাপ স্পষ্ট। সাম্প্রতিক নানা ঘটনা, অভিযোগ এবং আইনি পদক্ষেপের পর এই রিসোর্টের চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।

সাভানা রিসোর্টের বর্তমান চিত্র: ফাঁকা পরিবেশ, সীমিত কার্যক্রম

সোমবার সকাল ৯টার দিকে রিসোর্টে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে প্রধান ফটকটি বন্ধ। বাইরে কয়েকজন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন ঠিকই, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়—জায়গাটা আগের মতো নেই।

ফটকের পাশেই অভ্যর্থনা কক্ষ, যেখানে এখনো নিয়ম-কানুন লেখা বোর্ড ঝুলছে। ভেতরে ঢুকলেই ডান পাশে দুটি পুকুর, তবে সেখানে কোনো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। পাকা রাস্তা ধরে একটু এগোলেই দেখা যায় কিছু খালি পুকুর পড়ে আছে, যেন ব্যবহারহীন হয়ে গেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি ফেরিস হুইল, যা এখন আর ঘোরে না। একসময় যেখানে শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যেত, এখন সেখানে নীরবতা। আরও সামনে গেলে দেখা যায় ছোট ছোট কটেজ, কিন্তু সেগুলোতেও নেই কোনো অতিথি। সুইমিংপুলটাও খালি পড়ে আছে—জল আছে, কিন্তু মানুষ নেই।

অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

এই রিসোর্টটি ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হচ্ছে এর নির্মাণ প্রক্রিয়া। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে এই বিশাল প্রকল্পটি গড়ে তুলেছিলেন।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর এই রিসোর্ট তৈরি করা হয়। আর এই জমির বড় অংশই নেওয়া হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। অনেকেই বলেন, তারা স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করেননি, বরং ভয় দেখিয়ে, চাপ প্রয়োগ করে এবং নানা কৌশলে জমি নিতে বাধ্য করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও বেদনা

বৈরাগী টোল গ্রামের বাসিন্দারা এখনো সেই সময়ের কথা ভুলতে পারেননি। একজন স্থানীয় বাসিন্দা সঞ্জয় বল জানান, তারা বহু বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।

তার ভাষায়, “আমরা নিজের জমিতে এখনো যেতে পারি না। আমাদের পুকুর, জমি সবই হাতছাড়া হয়ে গেছে। যারা প্রতিবাদ করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দেওয়া হয়েছিল।”

এই কথাগুলো শুনলে বোঝা যায়, বিষয়টা শুধু একটি রিসোর্ট নয়—এটা অনেক মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর সমস্যা।

গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ

সম্প্রতি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি ছিল। বাংলাদেশ সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এই ঘটনার পর রিসোর্টটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এখন আশা করছেন, হয়তো তারা তাদের হারানো সম্পত্তি ফিরে পাবেন।

আদালতের নির্দেশে সম্পত্তি জব্দ

২০২৪ সালের জুন মাসে আদালতের নির্দেশে এই রিসোর্টসহ বেনজীর আহমেদের বিভিন্ন সম্পদ জব্দ করা হয়। এরপর প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।

রিসোর্টটি বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং অভিযোগ ওঠে, জব্দের পর রাতের আঁধারে কিছু মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে দুদক এবং জেলা প্রশাসন মাইকিং করে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

পরে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়—কৃষিজমি দেখভালের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং পুকুরগুলোর জন্য জেলা মৎস্য কর্মকর্তা।

ইজারা প্রক্রিয়া ও আর্থিক বাস্তবতা

২০২৫ সালে দরপত্রের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান এক বছরের জন্য রিসোর্টটি ইজারা নেয়। পুকুর এবং পার্ক মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা নির্ধারণ করা হয়।

তবে পরের বছর দেখা যায়, পুকুরে লোকসান হওয়ায় শুধু পার্ক অংশই আবার ইজারা নেওয়া হয়। নতুন করে ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করে ইজারা দেওয়া হয়।

বর্তমান ইজারাদারদের মতে, তারা আগের লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। প্রায় ৪০ জন কর্মী এখনো কাজ করছেন এবং মাসিক খরচ প্রায় ৭ লাখ টাকা।

লোকসান ও দর্শনার্থী সংকট

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দর্শনার্থীর অভাব। আগের মতো মানুষ এখন আর আসছে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনসহ নানা কারণে গত বছর দর্শনার্থী অনেক কম ছিল।

পুকুরগুলো প্রায় অকেজো হয়ে গেছে, আর পার্কে ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যাও হাতে গোনা। শুধু শীতকাল বা পিকনিক মৌসুমে কিছুটা ভিড় আশা করা যায়।

ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা

তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি রিসোর্টটি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু দর্শনার্থী আসতে শুরু করে। একদিন দেখা যায়, কয়েকজন যুবক টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকছেন।

এটা হয়তো ছোট একটা ইঙ্গিত—সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে এখনো অনেক পথ বাকি।

ভবিষ্যৎ কী?

সব মিলিয়ে সাভানা ইকো রিসোর্ট এখন এক অদ্ভুত অবস্থায় আছে। একদিকে আইনি জটিলতা, অন্যদিকে আর্থিক লোকসান—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যাদের জমি নিয়ে এই প্রকল্প তৈরি হয়েছে, তারা কি তাদের অধিকার ফিরে পাবেন? প্রশাসন কি সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—এই রিসোর্ট শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি ক্ষমতা, অনিয়ম এবং মানুষের জীবনের বাস্তব গল্পের একটি বড় উদাহরণ।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো।