বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর সমর্থকদের উৎসব। তবে এবার সেই উৎসব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহরে তৈরি হয়েছে বিয়ার সংকট। স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের হাজার হাজার সমর্থক বিশ্বকাপ উপলক্ষে শহরে ভিড় জমিয়ে এমন পরিমাণ বিয়ার পান করেছেন যে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কার্যত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রায় ৫০ হাজার স্কটল্যান্ড সমর্থক বর্তমানে বস্টনে অবস্থান করছেন। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রিয় দলকে সমর্থন করার পাশাপাশি তাঁরা উপভোগ করছেন উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে তাদের উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে বিয়ার।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের প্রথম দুটি ম্যাচ বস্টনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিপুল সংখ্যক সমর্থক শহরে জড়ো হয়েছেন। বহু বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে স্কটল্যান্ডের প্রত্যাবর্তন সমর্থকদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। ফলে ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝের সময়জুড়ে শহরের বিভিন্ন বার, পাব ও রেস্তোরাঁয় উপচে পড়ছে ভিড়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, স্কটিশ সমর্থকেরা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এমন পরিমাণ বিয়ার পান করেছেন যা সাধারণত বস্টনের বাসিন্দারা পুরো এক সপ্তাহে খরচ করেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই পরিমাণও নাকি চারগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
বস্টনের পানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব বলছে, বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহেই বিক্রির পরিমাণ রেকর্ড ছুঁয়েছে। বিভিন্ন পাব ও বারে বিয়ারের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় নতুন করে সরবরাহ আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের জনপ্রিয় নাম ‘তার্তান আর্মি’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁরা তাঁদের প্রাণবন্ত সমর্থনের জন্য পরিচিত। বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
হাইতির বিপক্ষে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার পর স্কটিশ সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন আরও বেড়ে যায়। দল জেতার পর শহরের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় উদযাপন। গান, নাচ, বাগপাইপারের সুর এবং বিয়ার—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে গোটা বস্টন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত বিয়ার সরবরাহের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন চালান আনার উদ্যোগ নেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, সময়মতো সরবরাহ না পৌঁছালে বিক্রি বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী জানান, তিন দশকের ব্যবসায়িক জীবনে তিনি কখনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের কারণে পর্যটকের চাপ বাড়লেও স্কটল্যান্ড সমর্থকদের বিয়ার চাহিদা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।
বস্টন বিয়ার কোম্পানির তথ্য অনুসারে, স্বাধীনতা উদযাপনের সময় শহরে যে পরিমাণ মদ বিক্রি হয়, স্কটিশ সমর্থকেরা তার চারগুণ পর্যন্ত খরচ করেছেন। মাত্র চার দিনে প্রায় ৪,০০০ পিন্ট বিয়ার বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে।
যদিও মজুত সংকট ব্যবসায়ীদের কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছে, তবুও বিক্রির রেকর্ড তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালীন এই কয়েক দিনে তারা বছরের অন্যতম সেরা বাণিজ্যিক সময় পার করছে।
স্কটিশ সমর্থকদের নিয়ে সাধারণভাবে ‘উৎসবপ্রিয়’ এবং ‘মদপ্রেমী’ হিসেবে নানা ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু বস্টনে তারা শুধু বিয়ার পান করেই আলোচনায় আসেননি; বরং তাদের শৃঙ্খলাবোধও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ম্যাচের দিন শহরের রাস্তাজুড়ে বাগপাইপারের সুরে মিছিল করে স্টেডিয়ামের দিকে যেতে দেখা যায় হাজারো সমর্থককে। তারা আনন্দ উদযাপন করেছেন, গান গেয়েছেন, বিয়ার পান করেছেন, কিন্তু শহরকে নোংরা করেননি। বরং অনুষ্ঠান শেষে নিজেরাই আবর্জনা পরিষ্কার করে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এই আচরণ স্থানীয় বাসিন্দাদের মন জয় করেছে এবং অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্কটিশ সমর্থকদের প্রশংসা করেছেন।
বস্টনের অনেক বাসিন্দা হয়তো নিয়মিত ফুটবল অনুসরণ করেন না। কিন্তু স্কটিশ সমর্থকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
স্থানীয়দের মধ্যে এখন একটি জনপ্রিয় স্লোগান শোনা যাচ্ছে—“নো স্কটল্যান্ড, নো পার্টি।” অর্থাৎ, স্কটল্যান্ড না থাকলে যেন উৎসবের রংই ফিকে হয়ে যায়। সমর্থকদের উপস্থিতি শুধু শহরের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেনি, বরং এক ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক পরিবেশও তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের পরবর্তী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ফ্লোরিডায়, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ব্রাজিল। ফলে খুব শিগগিরই হাজার হাজার স্কটিশ সমর্থক বস্টন ছেড়ে নতুন গন্তব্যে পাড়ি জমাবেন।
এতে শহরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে তারা স্বস্তি পাচ্ছেন যে বিয়ার সরবরাহের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে এত বড় ক্রেতা গোষ্ঠীকে হারানোর আক্ষেপও রয়েছে। কারণ স্কটিশ সমর্থকদের কারণে যে ব্যবসায়িক সাফল্য এসেছে, তা সহজে ভুলে যাওয়ার মতো নয়।
বিশ্বকাপ ফুটবল শুধুমাত্র মাঠের লড়াই নয়, এটি সমর্থকদের আবেগ, সংস্কৃতি ও উদযাপনেরও এক বিশাল মঞ্চ। স্কটল্যান্ড সমর্থকদের বিয়ার উন্মাদনা বস্টনে সাময়িক সংকট তৈরি করলেও তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি, শৃঙ্খলাবোধ এবং উৎসবমুখর আচরণ শহরের মানুষের হৃদয় জয় করেছে। বিশ্বকাপের এই অনন্য অধ্যায় প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়—এটি মানুষের মিলনমেলা, যা এক শহরকে কয়েক দিনের জন্য হলেও অন্যরকম করে তুলতে পারে।

