আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় দেশের ভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হলেও দেশের বাজারে এখনও সেই প্রভাব দৃশ্যমান নয়। ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম কমছে, তখন বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কবে কমবে?
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। মে মাসের শুরুতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল প্রায় ১০৭ ডলার। জুনের শুরুতে তা কমে ৯৮ ডলারে নেমে আসে। পরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার ফলে তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রায় ৭৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি দাম কমেছে প্রায় ৪১ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী দিনগুলোতে দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৫ সালের মে ও জুন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৬১ থেকে ৬৫ ডলারের মধ্যে ছিল। সেই হিসেবে বর্তমান দাম এখনও গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে চলতি বছরের মার্চ মাসে যখন তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখনকার তুলনায় বর্তমান মূল্য অনেক কম।
বিশ্ববাজারে এই পতন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কারণ আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করেই সম্প্রতি দেশে কয়েক দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। সেই সময় সরকার ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করে।
১৮ এপ্রিলের মূল্য সমন্বয়ে—
* ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়।
* কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়।
* অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
* পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা করা হয়।
এরপর জুন মাসে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি আরও ৫ টাকা বাড়ানো হয়।
বর্তমানে বাজারে—
* অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ টাকা লিটার।
* পেট্রোল ১৪০ টাকা লিটার।
* কেরোসিন ১৩৫ টাকা লিটার।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকলেও সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারি নীতির ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে দ্রুত সমন্বয় করা হলেও দাম কমার ক্ষেত্রে সেই গতি দেখা যায় না।
এই কারণেই এখন ভোক্তাদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি ৪১ ডলার পর্যন্ত কমেছে, তখন দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন দেখা উচিত।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্প্রতি এক বক্তব্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত সমাধান হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও সেই অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হবে।
সরকারের এই প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। অতীতেও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হবে। তবে বাস্তবে কত দ্রুত সেই সমন্বয় করা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সাধারণত প্রতি মাসের শেষে সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। তবে প্রয়োজন হলে মাসের মাঝামাঝিও মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের মতে, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে কমিশন নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে মূল্য নির্ধারণ করে। সেখানে দামের ১০ শতাংশ ওঠানামা হলে মাসের মাঝামাঝি সময়েও মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
তিনি মনে করেন, একই ধরনের বিধান জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও থাকলে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে দ্রুত মূল্য সমন্বয় করতে পারত।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে সেই সুবিধা দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছানো উচিত। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশীয় বাজারেও দ্রুত বৃদ্ধি করা হয়, কিন্তু দাম কমার সময় একই হারে হ্রাস করা হয় না।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বর্তমান পরিস্থিতিতেই জ্বালানি তেলের দাম পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ করলে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবে, তেমনি পরিবহন ও উৎপাদন খরচও কমবে।
দেশে জ্বালানি তেলের দাম কমলে এর প্রভাব শুধু যানবাহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে—
* পরিবহন ব্যয়ে
* কৃষি উৎপাদন খরচে
* শিল্প কারখানার পরিচালন ব্যয়ে
* নিত্যপণ্যের বাজারদরে
* সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে
বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমলে কৃষক, পরিবহন মালিক ও সাধারণ ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বাজারেও মূল্য হ্রাসের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম মার্চ মাসের তুলনায় অনেক কম অবস্থানে রয়েছে। ফলে সরকারের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয় দাঁড়িয়েছে—বিশ্ববাজারের এই সুবিধা কত দ্রুত দেশের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
যদি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমন্বয় করা হয়, তাহলে জ্বালানি তেলের দাম কমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে পারে। এখন নজর থাকবে সরকারের পরবর্তী মূল্য নির্ধারণী সিদ্ধান্তের দিকে।

