বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করলেন আরেকটি শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ। জাপানের দুর্দান্ত প্রতিরোধ ভেঙে শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির দুর্দান্ত গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিল ব্রাজিল। এই জয়ের মাধ্যমে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল কার্লো আনচেলত্তির দল, আর জাপানের স্বপ্ন ভেঙে গেল আরেকবার নকআউট পর্বেই।
শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। জাপান নিজেদের সংগঠিত রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে ব্রাজিলকে একাধিকবার চাপে ফেলে। অন্যদিকে ব্রাজিল বলের দখল ধরে রেখে সুযোগ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যায়।
প্রথমার্ধে জাপানের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স ব্রাজিলকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে। তবে বিরতির পর মাঠে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ব্রাজিল আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে।
বিরতির পর ব্রাজিলের খেলায় আসে নতুন গতি। মিডফিল্ড থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার পাশাপাশি উইং ব্যবহার করে জাপানের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে সেলেসাওরা।
জাপানও পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক ছিল। ফলে ম্যাচটি হয়ে ওঠে দারুণ উপভোগ্য। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই জয় পাবে না এবং ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে।
সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন ম্যাচ শেষে বলেন, ব্রাজিলের সমতা ফেরানোর সম্ভাবনা আগেই তৈরি হয়েছিল। তবে এরপর জাপানও দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে এবং লড়াই জমে ওঠে।
তার মতে, ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু বড় দলগুলো ঠিক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির সেই অসাধারণ গোলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। কার্লো আনচেলত্তি আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সফল কোচ।
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকেই এগোচ্ছিল, তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
অতিরিক্ত সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েস অসাধারণ একটি থ্রু পাস বাড়িয়ে দেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির উদ্দেশে। চাপের মধ্যেও দারুণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণ করে মার্টিনেলি নিখুঁত শটে পোস্টে লাগিয়ে জালে পাঠান বল।
গোল হতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন ব্রাজিলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থক। কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনে মেতে ওঠেন মার্টিনেলি।
যদিও গোলদাতা হিসেবে আলোচনায় মার্টিনেলি, তবে এই জয়ের অন্যতম নায়ক ব্রুনো গিমারায়েস। তার নিখুঁত পাসই গোলের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
মিডফিল্ডে পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি বলের দখল ধরে রাখেন, আক্রমণ গড়ে তোলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখেন।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই জাপানের খেলোয়াড়দের মুখে স্পষ্ট হতাশা দেখা যায়। টানা তৃতীয়বারের মতো নকআউট পর্বে খুব কাছ থেকে বিদায় নিতে হলো তাদের।
দলের খেলোয়াড়রা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলেও ভাগ্য শেষ মুহূর্তে তাদের বিপক্ষে চলে যায়। অতিরিক্ত সময়ের আগমুহূর্তে গোল হজম করায় জাপানের বিশ্বকাপ যাত্রার ইতি ঘটে।
গোল হজমের আগে শেষ চেষ্টা হিসেবে কোকি ওগাওয়াকে মাঠে নামায় জাপান। কোচের আশা ছিল নতুন এই পরিবর্তন হয়তো ম্যাচে নতুন প্রাণ আনবে। কিন্তু ব্রাজিলের দৃঢ় রক্ষণ এবং সময়ক্ষেপণের কৌশলের সামনে আর সুযোগ তৈরি করতে পারেনি জাপান।
ম্যাচের শেষদিকে একটি কর্নার থেকে ফাবিনিয়ো হেড করার সুযোগ পেলেও সেটি লক্ষ্যে রাখতে ব্যর্থ হন। বল অনেক ওপরে দিয়ে চলে যায়। যদিও সেটি শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলেনি, কারণ কয়েক মিনিট পরই আসে মার্টিনেলির জয়সূচক গোল।
শেষ বাঁশি বাজার আগেই ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় উৎসব। সবাই বুঝে গিয়েছিলেন, আর ফিরে আসা সম্ভব নয় জাপানের পক্ষে। ম্যাচ শেষ হতেই খেলোয়াড়রা সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উদযাপনে যোগ দেন।
অন্যদিকে জাপানের সমর্থকদের চোখে ছিল হতাশা। এত কাছ থেকে স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট তারা আবারও অনুভব করলেন।
এই জয়ের মাধ্যমে ব্রাজিল শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে। তবে সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। যদি একই আত্মবিশ্বাস, আক্রমণভাগের ধার এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে শিরোপার দৌড়ে ব্রাজিল নিঃসন্দেহে অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হয়ে থাকবে।
ব্রাজিল ও জাপানের এই লড়াই ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচগুলোর একটি। জাপান সাহসী ফুটবল খেলেও শেষ মুহূর্তের একটি অসাধারণ আক্রমণে হার মানে। অন্যদিকে ব্রাজিল প্রমাণ করেছে, বড় দলগুলো শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কখনো হাল ছাড়ে না। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির স্মরণীয় গোল এবং ব্রুনো গিমারায়েসের অসাধারণ পাসই শেষ পর্যন্ত সেলেসাওদের পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট এনে দেয়।


