খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

এআই কি সত্যিই একাকীত্ব দূর করতে পারে?

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এখন শুধু কাজের সহায়ক নয়, বরং অনেকের...
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগুগল এআইএআই কি সত্যিই একাকীত্ব দূর করতে পারে?

এআই কি সত্যিই একাকীত্ব দূর করতে পারে?

এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট, সামাজিক রোবট এবং ভার্চুয়াল সঙ্গীরা নতুন সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এখন শুধু কাজের সহায়ক নয়, বরং অনেকের কাছে বন্ধু, উপদেষ্টা, এমনকি আবেগের সঙ্গী হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এআই কি সত্যিই মানুষের একাকীত্ব দূর করতে পারবে, নাকি এটি কেবল সাময়িক সান্ত্বনার একটি মাধ্যম?

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, সামাজিক দূরত্ব এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতায় একাকীত্ব এখন বৈশ্বিক এক বড় সংকট। এই জায়গাতেই এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট, সামাজিক রোবট এবং ভার্চুয়াল সঙ্গীরা নতুন সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে।

বর্তমানে বহু মানুষ এআই-চালিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের জন্য। এসব প্ল্যাটফর্মের অন্যতম জনপ্রিয় উদাহরণ হলো ‘রেপ্লিকা’, যা কোটি কোটি মানুষের কাছে এক ধরনের ডিজিটাল সঙ্গী হিসেবে পরিচিত। ব্যবহারকারীরা এই এআই সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলেন, মনের কথা ভাগ করেন এবং অনেক সময় আবেগগত নির্ভরশীলতাও তৈরি করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী এআই চ্যাটবটকে মানুষের মতোই অনুভব করেন। অনেকে মনে করেন, এআই তাদের বুঝতে পারে এবং সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু এই অনুভূতির পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিগত অনুকরণ, বাস্তব আবেগ নয়।

বর্তমান সমাজে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত হলেও বাস্তবিক অর্থে সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধুত্ব থাকলেও গভীর সম্পর্কের অভাব বাড়ছে। এই শূন্যতা পূরণে এআই সহজলভ্য বিকল্প হয়ে উঠছে।

একটি এআই বট কখনো বিরক্ত হয় না, বিচার করে না, সব সময় উত্তর দেয় এবং ধৈর্য ধরে কথা শোনে। বাস্তব জীবনে এমন সঙ্গী পাওয়া কঠিন। ফলে অনেকেই মানসিক চাপ বা একাকীত্বে এআই-কে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

বিশেষ করে জাপানের মতো দেশে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সমস্যা ভয়াবহ। ‘হিকিকোমোরি’ নামে পরিচিত এই বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে লাখ লাখ মানুষ বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল সঙ্গীর ওপর নির্ভর করছেন।

এখানেই মূল প্রশ্ন। এআই মানুষের ভাষা বুঝতে পারে, প্রতিক্রিয়া দিতে পারে, এমনকি সহানুভূতির মতো আচরণও করতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে সত্যিকারের অনুভূতি নেই।

এআই দুঃখ অনুভব করে না, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয় না, ভালোবাসে না। এটি কেবল তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনভাবে উত্তর দেয়, যাতে মনে হয় সে বুঝছে।

একজন সত্যিকারের বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয় অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, স্মৃতি ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। এআই-এর মধ্যে এই উপাদানগুলোর কোনোটিই নেই।

এআই হয়তো সাময়িকভাবে একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে। কারও মন খারাপ হলে কথা বলা, মানসিক চাপ কমানো বা তাৎক্ষণিক সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি মানুষ বাস্তব সম্পর্কের বদলে এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হতে পারে। পরিবার, বন্ধুত্ব এবং প্রেমের মতো বাস্তব সম্পর্কের জায়গা সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য বাস্তব সম্পর্ক অপরিহার্য। কারণ মানুষের স্পর্শ, চোখের ভাষা, শারীরিক উপস্থিতি এবং আবেগের আদান-প্রদান কোনো যন্ত্র দিয়ে পুরোপুরি সম্ভব নয়।

বর্তমানে এমন ঘটনাও দেখা যাচ্ছে যেখানে মানুষ ভার্চুয়াল চরিত্রকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করছে। জাপানে হলোগ্রাম চরিত্র ‘হাতসুনে মিকু’-কে ঘিরে এমন উদাহরণ ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।

এটি দেখায়, এআই এখন কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি মানুষের আবেগের জায়গায় প্রবেশ করছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এআই ধর্মীয় পরামর্শদাতা বা মানসিক গাইড হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই প্রবণতা সমাজে নতুন ধরনের সম্পর্কের ধারণা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে মানবিক সম্পর্কের কাঠামো বদলে দিতে পারে।

ফরাসি দার্শনিক পল রিকোর মনে করতেন, মানুষের প্রকৃত সুখ আসে পারস্পরিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক সংযোগ থেকে। সুখ মানে শুধু নিজের ভালো থাকা নয়, বরং অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।

এই ধারণাকে সমর্থন করেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৮০ বছরের গবেষণা। গবেষণাটি বলছে, সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতি নয়—বরং ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক সম্পর্কই মানুষের দীর্ঘায়ু এবং সুস্থ জীবনের মূল ভিত্তি।

এটি প্রমাণ করে, মানুষের জীবনে বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।