বিজ্ঞান জগতে প্রায়ই এমন কিছু আবিষ্কার সামনে আসে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। এবার তেমনই এক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটালেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৫৩০০ বছর পুরনো একটি মমির শরীর থেকে উদ্ধার করা ইস্ট ব্যবহার করে তাঁরা তৈরি করেছেন সুস্বাদু সাওয়ারডাফ পাউরুটি। এই অসাধারণ গবেষণা শুধু ইতিহাসকেই নতুনভাবে সামনে আনেনি, বরং প্রাচীন জীবাণু এবং খাদ্যবিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনারও দরজা খুলে দিয়েছে।
১৯৯১ সালে ইতালি ও অস্ট্রিয়ার সীমান্তবর্তী আল্পস পর্বতমালার বরফের নিচ থেকে একটি মানবদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে এটি সাধারণ কোনো মৃতদেহ বলে মনে হলেও পরে গবেষণায় জানা যায়, এর বয়স প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর।
বরফের গভীরে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকার কারণে দেহটি অবিশ্বাস্যভাবে অক্ষত ছিল। গবেষকরা এই মমির নাম দেন “ওতজি”। পরে তিনি “ওতজি দ্য আইসম্যান” নামেও পরিচিতি পান। প্রাচীন মানব সভ্যতার জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা তথ্য জানার জন্য বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে এই দেহ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছেন।
গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা এক বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কার করেন। তাঁরা দেখতে পান, ওতজির শরীরে কিছু অণুজীব এখনও টিকে আছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ছিল ইস্টের উপস্থিতি।
সাধারণভাবে অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে অধিকাংশ অণুজীব টিকে থাকতে পারে না। তবে ওতজির শরীরে থাকা এই বিশেষ ইস্ট দীর্ঘ হাজার বছর ধরে বরফের মধ্যে থেকেও নিজেকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে ছিল।
গবেষকদের মতে, এই প্রাগৈতিহাসিক ইস্টের বেঁচে থাকা প্রমাণ করে যে প্রকৃতির কিছু অণুজীবের অভিযোজন ক্ষমতা অবিশ্বাস্য রকম শক্তিশালী হতে পারে।
মমির শরীর থেকে ইস্ট সংগ্রহ করার পর বিজ্ঞানীরা সেটিকে বিশেষ পরীক্ষাগারে পুনরায় সক্রিয় করেন। এরপর সেই ইস্ট ব্যবহার করে তাঁরা তৈরি করেন সাওয়ারডাফ পাউরুটি।
সাওয়ারডাফ এমন এক ধরনের পাউরুটি, যা সাধারণ ইস্টের পরিবর্তে প্রাকৃতিক গাঁজন পদ্ধতিতে তৈরি হয়। ফলে এর স্বাদ, গন্ধ এবং গঠন সাধারণ পাউরুটির তুলনায় ভিন্ন হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাজার বছরের পুরনো এই ইস্ট আধুনিক ইস্টের মতোই কাজ করেছে। এটি সফলভাবে গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং পাউরুটিকে ফুলিয়ে তোলে।
গবেষকদের অনেকেই প্রথমে মনে করেছিলেন এত পুরনো ইস্ট হয়তো কার্যকর হবে না। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল তাঁদের ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
এই গবেষণা শুধু পাউরুটি তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রাচীন মানবদেহে সংরক্ষিত অণুজীব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা করা সম্ভব।
ওতজির দেহে শুধু ইস্ট নয়, বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। এই অণুজীবগুলো প্রাচীন মানুষের স্বাস্থ্য, রোগব্যাধি এবং খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
এছাড়া ভবিষ্যতে খাদ্য প্রযুক্তি ও জীববিজ্ঞানে এই ধরনের গবেষণা নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। প্রাচীন অণুজীবের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে নতুন ধরনের খাদ্য তৈরির পথও খুলে যেতে পারে।
ওতজির দেহ আজও বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশাল গবেষণাগার হিসেবে কাজ করছে। হাজার বছরের পুরনো একটি মানবদেহ থেকে শুধু ইতিহাস নয়, খাদ্যবিজ্ঞান সম্পর্কেও নতুন তথ্য উঠে আসছে।
৫৩০০ বছর পুরনো মমির ইস্ট দিয়ে পাউরুটি তৈরির এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্য এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিটি নতুন গবেষণা আমাদের সামনে আরও বিস্ময় নিয়ে আসছে।
সময়ের বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক প্রাচীন মানুষের শরীর আজ আধুনিক বিজ্ঞানকে এমন এক গল্প শোনাচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও অনেকের কাছে কল্পকাহিনি মনে হতো।

