Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালছয় দফা থেকে মুক্তিযুদ্ধ: কীভাবে বদলে গেল বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস?

ছয় দফা থেকে মুক্তিযুদ্ধ: কীভাবে বদলে গেল বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস?

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক দাবি আদায়ের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে এবং তারা আন্দোলন দমনে নানা দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ছয় দফা আন্দোলন একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন শুধু একটি আন্দোলনের সূচনার দিন নয়, বরং এটি ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবিকে সুসংগঠিত করার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়।

আজও ছয় দফা দিবস বাঙালি জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার পথ তৈরি হয়েছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা, শিল্পায়ন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বণ্টনে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত করে।

এই শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী-এর মতো নেতারা বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ষাটের দশকে এই আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে শেখ মুজিবুর রহমান-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে লাহোরে একটি জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের নেতৃত্বে ছিলেন নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান।

এই সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্ত করা। তিনি আশা করেছিলেন যে এই দাবিগুলো সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। কিন্তু আয়োজকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন।

এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদস্বরূপ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং লাহোরে অবস্থানকালেই জনগণের সামনে ছয় দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন।

লাহোর থেকে ফিরে ১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু করেন। তিনি শহর থেকে গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জনপদ—সবখানে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ছয় দফার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।

ছয় দফার মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা। দ্রুতই এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বঞ্চিত বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

পরবর্তীতে ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদে ছয় দফা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। এর ফলে আন্দোলন আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী রূপ লাভ করে।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফার সমর্থনে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। শ্রমিক, ছাত্র, কৃষক ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক দাবি আদায়ের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে এবং তারা আন্দোলন দমনে নানা দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়।

তবে দমননীতি আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি। বরং জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ছয় দফা আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত হয়ে তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকের বিরুদ্ধে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন।

এই মামলার উদ্দেশ্য ছিল ছয় দফা আন্দোলনকে দুর্বল করা এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো ফল হয়। ছাত্রসমাজ ১১ দফা আন্দোলন গড়ে তোলে এবং গণআন্দোলনের তীব্র চাপে সরকার শেষ পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং স্বাধীনতার আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।

ছয় দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর ফলে পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। এই বিজয়ের পেছনে ছয় দফার জনপ্রিয়তা এবং জনগণের সমর্থন ছিল অন্যতম প্রধান শক্তি।

কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনীহা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে শুরু হয় মহান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ-এর অভ্যুদয় ঘটে।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছয় দফা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার নকশা। এটি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে সুসংগঠিত করে এবং স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ তাঁর বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ছয় দফা আন্দোলনকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাংলার জনগণের অদম্য সমর্থনের কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ছয় দফার চেতনা আজও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত। এটি অধিকার আদায়, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং আত্মমর্যাদার সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।