Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeঅর্থ-বানিজ্যবিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব বিশ্লেষণ

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব বিশ্লেষণ

রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে আজ যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ‘ডব্লিউটিআই’ ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৩৭ ডলার বা ২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৮৯ দশমিক ৭৩ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে।

বিশ্ববাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের নতুন মাত্রা, আন্তর্জাতিক তেল বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পেছনের মূল কারণ

বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও তীব্র হওয়া। ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভেতরে আরও গভীরে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যায়। এই উদ্বেগ সরাসরি তেলের দামে প্রভাব ফেলেছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম সবসময় সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। যখনই কোনো বড় উৎপাদনকারী অঞ্চল বা পরিবহন রুট ঝুঁকিতে পড়ে, তখনই বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এবারও ঠিক তাই হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সর্বশেষ অবস্থা

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল (WTI) ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.৭১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮৯.৭৩ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামও ২.৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৩.২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এই বৃদ্ধি খুব ছোট মনে হলেও, বাস্তবে এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় সংকেত। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত—সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়ে যায়।

ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত: নতুন অনিশ্চয়তা

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার পরও পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। বরং নতুন করে সংঘাত বাড়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

এই সংঘাত শুধু দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে বড় আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে ইরান-সম্পৃক্ত বৃহত্তম আঞ্চলিক উত্তেজনা হিসেবে দেখছেন।

সংঘাতের শুরু হয় যখন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করে। পরে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলেও সীমান্তে উত্তেজনা এখনো থামেনি। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালি: বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়।

বর্তমানে এই প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেছে। সেখানে মাইন পেতে রাখা হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালি পুরোপুরি নিরাপদ করতে সময় লাগবে। আর যতদিন এটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে, ততদিন তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে না।

সরবরাহ সংকট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

তেলের বাজারে সরবরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধরো, বাজারে হঠাৎ তেলের সরবরাহ কমে গেল—তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে যাবে। এখন ঠিক এই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনকি যদি নতুন কোনো শান্তি চুক্তি হয়, তবুও রাতারাতি বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে না। কারণ উৎপাদন ও পরিবহন স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।

চীনের অর্থনীতি ও তেলের চাহিদা

বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হলো চীন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনের শিল্প খাত কিছুটা ধীর হয়ে গেছে।

রপ্তানি কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে চীনের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণত এটি তেলের চাহিদা কমিয়ে দেয়, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত।

কিন্তু এবার বিষয়টা আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এতটাই তীব্র যে, চাহিদা কমার প্রভাবকে ছাপিয়ে সরবরাহ সংকটই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

তেলের দাম বাড়ার মানে শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দাম বাড়া নয়। এর প্রভাব অনেক বড়।

প্রথমত, পরিবহন খরচ বাড়ে। এতে পণ্যের দামও বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের ভেতরেও তার প্রভাব পড়ে।

সামনে কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, তেলের বাজারে অস্থিরতা দ্রুত কমবে না। যতদিন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমছে না, ততদিন দাম ওঠানামা করতেই থাকবে।

যদি সংঘাত আরও বাড়ে, তাহলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আবার যদি শান্তি আলোচনা সফল হয়, তাহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।

শেষ কথা

পুরো বিষয়টা সহজভাবে বললে, তেলের বাজার এখন এক ধরনের চাপের মধ্যে আছে। একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে সরবরাহ ঝুঁকি—এই দুইয়ের কারণে দাম বাড়ছে।

আমাদের জন্য এর মানে হলো, আগামী দিনে জ্বালানি খরচ বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি—যেমন অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানো বা বিকল্প শক্তির দিকে নজর দেওয়া।

বিশ্ব রাজনীতি আর অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে আছে, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

সূত্র: রয়টার্স