কলকাতায় ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। মঙ্গলবার গভীর রাতে নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুন লাগার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে শহরের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে পুরনো প্রশ্ন। হোটেল, হাসপাতাল, কারখানা, বাজার কিংবা সরকারি ভবন—গত দুই দশকে কলকাতা একের পর এক বড় অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত হয়েছে, গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে, গ্রেফতার হয়েছে, নতুন নির্দেশিকা জারি হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর পরেই আবার একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
গত দুই দশকে কলকাতায় অন্তত আটটি বড় অগ্নিকাণ্ডে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কোথাও আগুনের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিষাক্ত ধোঁয়া, কোথাও আটকে পড়েছেন মানুষ, আবার কোথাও জরুরি বেরোনোর পথ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। অনেক ঘটনায় অভিযোগ এসেছে, ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বা থাকলেও তা কার্যকর ছিল না।
রাজনৈতিক পালাবদলও ঘটেছে এই সময়ে। বাম আমল শেষ হয়ে তৃণমূল সরকার এসেছে। এরপর রাজ্যে বিজেপির সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে কলকাতার পরিচিত ছবিটা খুব একটা বদলায়নি।
আগুন লাগার পর প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যায়। তদন্ত কমিটি তৈরি হয়। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে সেই সতর্কতা কতটা বজায় থাকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কলকাতার বড় অগ্নিকাণ্ডগুলির তালিকায় রয়েছে ২০০৬ সালের তপসিয়ার ঘটনা।
২২ নভেম্বর তপসিয়ার একটি চামড়া কারখানায় আগুন লাগে। সেই সময় কারখানার ভিতরে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন।
কিন্তু অভিযোগ ছিল, কারখানা থেকে বাইরে বেরোনোর জন্য কার্যত একটি মাত্র দরজা ছিল। আগুন লাগার পর সেই দরজার চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত কোনওক্রমে তালা ভেঙে শ্রমিকদের বের করে আনা হয়।
ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। কয়েক জন শ্রমিকের শরীরের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে যায়। সেই ঘটনায় মৃত্যু হয় ৯ জনের। আহত হন আরও ১৮ জন।
এই ঘটনা থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছিল কর্মক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ?
২৩ মার্চ ২০১০। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্টে ভয়াবহ আগুন শহরকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
বাড়ির ভিতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কেউ কোনওক্রমে বাইরে বেরিয়ে আসেন। আবার কেউ প্রাণ বাঁচাতে উপর থেকে ঝাঁপ দেন। অনেকেই আটকে পড়েছিলেন বদ্ধ সিঁড়ির মধ্যে।
ধোঁয়া এবং আগুনের কারণে তাঁদের বেরোনোর পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে জানা যায়, ওই অগ্নিকাণ্ডে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন কয়েকশো মানুষ।
স্টিফেন কোর্টের ঘটনা কলকাতার অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাকে আরও তীব্র করে। বিশেষ করে পুরনো ভবন, সরু সিঁড়ি এবং জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
৯ ডিসেম্বর ২০১১। কলকাতার ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে আগুন লাগে। হাসপাতালের বেসমেন্টে থাকা দাহ্য পদার্থ থেকেই আগুনের সূত্রপাত বলে জানা যায়।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া। হাসপাতালের রোগী, নার্স, চিকিৎসক ও কর্মীরা নিজেদের মতো করে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। বিশেষ করে আইসিইউতে থাকা রোগীদের অনেকেই নিজেদের উদ্যোগে বেরিয়ে যেতে পারেননি। ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা বহু রোগীও আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়েন।
এই ঘটনায় ৯৩ জনের মৃত্যু হয়।
আমরি হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড আবারও দেখিয়ে দিয়েছিল, হাসপাতালের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম সাধারণ ভবনের তুলনায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোগীদের একটা বড় অংশ নিজেরাই দ্রুত পালিয়ে যেতে পারেন না।
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। শিয়ালদহের সূর্য সেন স্ট্রিটের কাগজ ও প্লাস্টিকের বাজারে ভোরের দিকে আগুন লাগে।
সময়টা ছিল ভোর পৌনে ৪টে। বাজারের ভিতরে তখন বহু শ্রমিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন লাগার পর তাঁরা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সবাই নিরাপদে বেরোতে পারেননি।
অনেকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন। কাগজ ও প্লাস্টিকের মতো দাহ্য সামগ্রী থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সেই ঘটনায় ২০ জনের মৃত্যু হয়।
এই অগ্নিকাণ্ডও প্রশ্ন তুলেছিল, বাজার ও গুদাম এলাকায় শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ এবং দাহ্য সামগ্রীর পাশে মানুষের বসবাস বা ঘুমানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তা থাকা উচিত।
৯ মার্চ ২০২১। কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে পূর্ব রেলের নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিংয়ে আগুন লাগে।
আগুন ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে দমকলকর্মীরাও বিপদের মুখে পড়েন।
ওই ঘটনায় অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে ছিলেন পূর্ব রেলের ডেপুটি চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার, দমকলের চার কর্মী, এক পুলিশ অফিসার এবং আরপিএফের এক সদস্য।
কয়েক জনের মৃত্যু হয় ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে।
অগ্নিকাণ্ড শুধু ভবনে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য নয়, উদ্ধারকাজে যাওয়া দমকলকর্মীদের জন্যও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই ঘটনা তার ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
২৯ এপ্রিল ২০২৫। কলকাতার মেছুয়াবাজারের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
এই ঘটনায় দুই শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ১৩ জন।
ঘটনার পর এলাকায় থাকা হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। কী ভাবে আগুন লাগল, কেন দ্রুত মানুষকে বের করে আনা গেল না এবং হোটেলগুলিতে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না এসব বিষয় নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে অতিথিরা অনেক সময় ভবনের কাঠামো বা জরুরি নির্গমন পথ সম্পর্কে আগে থেকে কিছুই জানেন না। ফলে আগুন লাগলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
২৬ জানুয়ারি ২০২৬, সাধারণতন্ত্র দিবসের ভোরে কলকাতার পূর্ব প্রান্তের আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় একটি মোমো কারখানার গুদামে আগুন লাগে।
আগুন দ্রুত পাশের গুদামেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকেরা ছিলেন।
কয়েক জন শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে পারলেও অনেকেই আগুনে আটকে যান। উদ্ধারকারী দল প্রায় ৭২ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালিয়ে দেহাংশ উদ্ধার করে।
প্রাথমিক ভাবে ১৮ জনের দেহাংশ শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে ওই ঘটনায় মোট ২৭ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছিল। ফলে ঘটনার পরও মোট মৃতের সংখ্যা নিয়ে স্পষ্টতা তৈরি হয়নি।
এই ঘটনা আবারও শহরের গুদাম, কারখানা এবং শ্রমিকদের বসবাসের জায়গায় অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই তালিকার সর্বশেষ ঘটনা নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ড।
মঙ্গলবার গভীর রাতে হোটেলে আগুন লাগার পর ফের সামনে এসেছে কলকাতার হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন।
আদৌ ওই হোটেলে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। তিনি এই পরিস্থিতির জন্য পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ের অবহেলার প্রভাব বর্তমান প্রশাসনকে বহন করতে হচ্ছে।
পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও গাফিলতির অভিযোগে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন এই ঘটনার পরও কি কয়েক বছর পরে আবার একই ধরনের কোনও অগ্নিকাণ্ড ঘটবে?
কলকাতার গত দুই দশকের বড় অগ্নিকাণ্ডগুলির দিকে তাকালে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে। প্রতিটি বড় ঘটনার পরেই প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায়।
তদন্ত কমিটি গঠন হয়। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়। কোথাও গ্রেফতার হয়। কোথাও নতুন নির্দেশিকা জারি হয়। কোথাও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের তরফে কড়া বার্তা দেওয়া হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই তৎপরতা কমে যায় বলেই বারবার অভিযোগ ওঠে।
তারপর অন্য কোনও ভবনে আগুন লাগে। আবার প্রশ্ন ওঠে। আবার তদন্ত হয়। আবার বলা হয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই চক্রটাই কি কলকাতার অগ্নিনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় সমস্যা?
গত দুই দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের পরে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। বর্তমানে বিজেপি সরকার রাজ্য পরিচালনা করছে।
কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সরকার বদলালেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
কারণ অগ্নিনিরাপত্তা কেবল সরকারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত পুরসভা, দমকল, পুলিশ, ভবন মালিক, হোটেল কর্তৃপক্ষ, কারখানা মালিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থাগুলিও।
কোনও ভবনে আগুন লাগার পর দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার পথ খোলা আছে কি না, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কাজ করছে কি না, জরুরি সিঁড়ি ব্যবহারযোগ্য কি না, বিদ্যুৎ সংযোগ নিরাপদ কি না এসব বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আগুন লাগার পরে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা জরুরি।
গত দুই দশকের ঘটনাগুলি একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আনে। কলকাতায় বড় অগ্নিকাণ্ড নতুন কিছু নয়। নতুন হচ্ছে শুধু আগুন লাগার জায়গা এবং নিহতের সংখ্যা।
কখনও হাসপাতাল, কখনও বাজার, কখনও কারখানা, কখনও সরকারি ভবন, আবার কখনও হোটেল—জায়গা বদলেছে। কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন প্রায় একই থেকেছে।
তাই নিউ মার্কেটের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা দোষীদের শাস্তির আশ্বাসই যথেষ্ট নয়। দরকার শহরের অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলির নিয়মিত এবং কঠোর পরিদর্শন।
কারণ আগুন লাগার পর প্রশাসন জেগে ওঠা কোনও সমাধান নয়। আসল সাফল্য হবে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে আগুন লাগার আগেই বিপদ চিহ্নিত হয় এবং একটি দুর্ঘটনা আর কখনও বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ না হয়ে ওঠে।
কলকাতার সামনে তাই প্রশ্ন একটাই প্রতিবার আগুনের পর কয়েক দিনের তৎপরতা, নাকি এবার সত্যিই বদলাবে শহরের অগ্নিনিরাপত্তার ছবি?
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

