কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৮ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ‘আজকের আলো’ পত্রিকার সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা সিমমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশিস দত্ত এবং শ্বশুর আক্রম আলি। একই ঘটনায় ঢাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবুরও মৃত্যু হয়েছে।
মৃত ৯ জনের মধ্যে বাকি তিন বাংলাদেশির পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। অন্যদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল থেকে প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশি নাগরিক।
নিহত সাংবাদিক দেবাশিস দত্তের স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য স্ত্রী ও তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে ভারতে এসেছিলেন দেবাশিস। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন দেবাশিসের শ্বশুর আক্রম আলি।
পরিবারটি প্রথমে বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসার জন্য যায়। সেখানকার চিকিৎসা শেষে কলকাতায় আসেন তাঁরা। থাকার জন্য নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ হোটেলকে বেছে নিয়েছিলেন।
কিন্তু কেউই ভাবতে পারেননি, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে করা এই সফর শেষ পর্যন্ত পরিবারের চার সদস্যের প্রাণ কেড়ে নেবে।
মধ্যরাতে আচমকা হোটেলে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন ঘর ধোঁয়ায় ভরে যায়। ঘুমন্ত আবাসিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে অনেকেই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু ধোঁয়ার ঘনত্ব এতটাই বেশি ছিল যে অনেকের পক্ষে নিরাপদে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় দেবাশিস দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা সিমমিন, তিন বছরের সন্তান স্বর্ণশিস এবং শ্বশুর আক্রম আলির।
একটি পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এই অগ্নিকাণ্ডে ঢাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবুও প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে এখনও পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া বাংলাদেশি নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
তবে মৃত ৯ জনের মধ্যে বাকি তিন বাংলাদেশির পরিচয় এখনও জানা যায়নি। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে অসুস্থ হয়ে পড়া ৬ বাংলাদেশি আপাতত বিপন্মুক্ত রয়েছেন।
ভোররাতেই বিপজ্জনক ওই ভবন থেকে একে একে প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আগুনের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন হোটেলের অন্যান্য আবাসিকরাও। দমকল ও পুলিশের তৎপরতায় অনেককেই নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে এত বড় সংখ্যক মানুষকে উদ্ধার করা গেলেও ৯ জনকে আর বাঁচানো যায়নি।
ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা পর্যটনের জন্য প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যান।
বিশেষ করে কলকাতা বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে অন্যতম পরিচিত গন্তব্য। অনেকে কলকাতায় চিকিৎসা করাতে যান। আবার কেউ বেঙ্গালুরু, ভাইজাগসহ ভারতের অন্যান্য শহরেও চিকিৎসার জন্য যান।
এছাড়া কেনাকাটা, ব্যবসা কিংবা ঘুরতে যাওয়ার কারণেও কলকাতায় বাংলাদেশিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।
এই কারণে নিউমার্কেটের মতো জনপ্রিয় এলাকায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহতের বিষয়টি দুই দেশের মানুষের মধ্যেই গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হোটেলে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসি বিস্ফোরণের জেরেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার তদন্তের জন্য ইতিমধ্যেই পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না এবং আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হবে।
এদিকে মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল ফায়ার অডিট সংক্রান্ত রিপোর্ট দ্রুত তলব করেছেন। হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দেবাশিস দত্ত তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে ভারতে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিল ছোট সন্তান ও শ্বশুর। পরিবারের আশা ছিল চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন তাঁরা।
কিন্তু নিউমার্কেটের হোটেলের সেই রাত তাঁদের জীবনের সব হিসাব বদলে দিল। একটি পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু তাঁদের স্বজনদের নয়, কলকাতা ও বাংলাদেশের বহু মানুষের মধ্যেও গভীর শোক তৈরি করেছে।
এখন তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে নিহতদের পরিবার এবং স্বজনেরা। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং এত প্রাণহানি কেন ঘটল এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

