কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে পড়েছিলেন এক বাংলাদেশি দম্পতি। রাতের ঘুম ভেঙেছিল দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দে। দরজা খুলতেই চোখে পড়ে চারপাশে ঘন কালো ধোঁয়া। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁরা বুঝতে পারেন, ঘরের বাইরে বের হওয়া মানেই ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়া।
শেষ পর্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রাণে বাঁচেন সোমাইয়া আখতার ও তাঁর স্বামী রেজাউল ইসলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার ঝুঁকি না নিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন তিনতলার কার্নিশে। প্রায় আধ ঘণ্টা সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁরা। পরে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নিচে থাকা লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। খবর পেয়ে দমকল কর্মীরা মই দিয়ে তাঁদের নিরাপদে নামিয়ে আনেন।
কলকাতার বহুল আলোচিত ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হোটেলের অন্যান্য আবাসিকদের মধ্যেও।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় হোটেলের ভেতরে তৈরি হয় ধোঁয়ার ভয়াবহ পরিবেশ। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে বিভিন্নভাবে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন, আবার কেউ নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষা করেন দমকল কর্মীদের।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই বুদ্ধি ও সাহসের পরিচয় দেন বাংলাদেশি দম্পতি সোমাইয়া ও রেজাউল।
সোমাইয়া আখতার ও রেজাউল ইসলাম বাংলাদেশের বাসিন্দা। প্রায় সাত দিন আগে তাঁরা কলকাতায় বেড়াতে এসেছিলেন। ভ্রমণের সময় থাকার জন্য তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন শিখা ইন হোটেলকে।
ঘটনার দিন রাতে অন্য আবাসিকদের মতোই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েন তাঁরা। বাইরে যে ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি।
কিন্তু গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দে তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে বুঝতে পারেন তাঁরা। চারপাশে তখন শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া।
এক মুহূর্তেই আনন্দের ভ্রমণ বদলে যায় প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু রেজাউল ইসলাম সেই ভুল করেননি। চারপাশের পরিস্থিতি দেখে তিনি বুঝতে পারেন, ধোঁয়ায় ভরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
তাই স্ত্রীকে নিয়ে জানালার কাছে যান তিনি। এরপর জানালা দিয়ে বেরিয়ে দু’জনে দাঁড়ান হোটেলের তিনতলার কার্নিশে।
সেখানে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু ওপর থেকে রাস্তা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল না। একইভাবে নিচে থাকা মানুষজনও তাঁদের দেখতে পাচ্ছিলেন না।
তখনই জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেন দম্পতি।
সোমাইয়া আখতার জানিয়েছেন, কার্নিশে দাঁড়িয়ে তাঁরা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। কিন্তু শুধু চিৎকার করে নিচে থাকা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হচ্ছিল না।
তখন মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে দেন তাঁরা।
অন্ধকারের মধ্যে ওপর থেকে মোবাইলের আলো বারবার জ্বালানোয় শেষ পর্যন্ত তাঁদের অবস্থান বোঝা সম্ভব হয়। এই ছোট্ট বুদ্ধিই তখন তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
প্রায় আধ ঘণ্টা কার্নিশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় তাঁদের। নিচে তখন উদ্ধারকাজ চলছিল। একদিকে আগুন ও ধোঁয়ার ভয়, অন্যদিকে তিনতলার সরু কার্নিশে দাঁড়িয়ে থাকার আতঙ্ক সব মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের কাছে ছিল ভয়াবহ।
অবশেষে দমকল কর্মীরা তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর মইয়ের সাহায্যে তিনতলার কার্নিশ থেকে সোমাইয়া ও রেজাউলকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনা হয়।
দমকলের মই তাঁদের কাছে যেন জীবনের শেষ আশ্রয় হয়ে এসেছিল। নিরাপদে মাটিতে পা রাখার পরই তাঁরা বুঝতে পারেন, কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাঁদের যেতে হয়েছে।
সোমাইয়ার কথায়, কার্নিশে দাঁড়িয়ে তাঁরা শুধু আগুনের আতঙ্কে চিৎকার করছিলেন। নিচ থেকে কেউ তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত ছিলেন না। তাই মোবাইলের আলো জ্বালানো ছাড়া আর কোনো উপায় তাঁদের হাতে ছিল না।
প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই রাতের স্মৃতি সহজে ভুলতে পারছেন না সোমাইয়া ও রেজাউল। বিশেষ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার কথা ভাবলেই তাঁদের ভয় করছে।
কারণ আগুনের সময় ধোঁয়া খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে ভুল পথে এগিয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। রেজাউলের ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে দিয়েছে।
তাঁরা যদি সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করতেন, তাহলে কী হতে পারত এখন সেই প্রশ্নই বারবার মনে পড়ছে তাঁদের। একইভাবে জানালা দিয়ে বেরিয়ে কার্নিশে দাঁড়ানোর সুযোগ না পেলেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঘটনা নয়, বরং হোটেলে থাকার সময় জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়, তারও একটি বড় শিক্ষা।
অপরিচিত শহরে ভ্রমণের সময় হোটেলে ওঠার পর জরুরি বহির্গমন পথ কোথায়, সিঁড়ি ও বিকল্প বের হওয়ার রাস্তা কোন দিকে—এসব বিষয় আগে থেকেই দেখে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আগুন লাগলে আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।
সোমাইয়া ও রেজাউলের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বিপদের মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের একটি সঠিক সিদ্ধান্তও জীবন বাঁচাতে পারে।
কলকাতায় আনন্দের ভ্রমণে যাওয়া এই বাংলাদেশি দম্পতির রাত শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিল মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতায়। মোবাইল ফোনের ছোট্ট একটি আলো এবং ঠান্ডা মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্তই তাঁদের জীবনের সেই অন্ধকার রাত থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছে।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

