প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংসদ সদস্যদের ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির মনোনীত এই নেতা এর আগে দীর্ঘদিন দলটির মহাসচিব এবং সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদ, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ—মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের পথটি ছিল দীর্ঘ ও নানা বাঁকে ভরা।
বিএনপির কঠিন রাজনৈতিক সময়ে দলের নেতৃত্ব দেওয়া, একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখার কারণে তিনি দলের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। একই সঙ্গে তুলনামূলকভাবে নম্র, ভদ্র ও পরিমিত ভাষার রাজনীতিক হিসেবেও তার আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়।
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের শুরু
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।
ছাত্ররাজনীতির সেই সময়টি পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তবে শিক্ষা শেষ করার পর সরাসরি পেশাদার রাজনীতিতে না গিয়ে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
শিক্ষকতা থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে
১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। তবে সরকারি চাকরির পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক ও জাতীয় রাজনীতির অন্দরমহলের সঙ্গে তার সরাসরি পরিচয় তৈরি হয়।
ন্যাপ থেকে বিএনপির রাজনীতিতে
জাতীয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল প্রথমে বিএনপিতে যোগ দেননি।
১৯৮৬ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। এরপর স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে ওঠার আগে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি।
এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল।
১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হন।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায় উত্থান
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রথমবার সংসদ সদস্য হতে পারেননি মির্জা ফখরুল।
তবে পরবর্তী সময়ে তার সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত হতে থাকে।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
সেই বছরই চারদলীয় জোট সরকারে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের সময় তাকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়।
২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।
এর আগে ও পরে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। সংগঠনটির প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
বিএনপির কঠিন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয় ২০০৬ সালের পর।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। দলটি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় সংকটে পড়ে।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির ভরাডুবি হয়। ওই নির্বাচনে মির্জা ফখরুল দলের মনোনয়ন পেলেও জয়ী হতে পারেননি।
এরপর ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া।
এই সময় থেকেই বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে।
আন্দোলন, মামলা ও গ্রেপ্তারের মধ্যেও নেতৃত্ব
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি আন্দোলনে গেলে দলের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ে। বিএনপির বহু শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হন এবং নানা মামলায় জড়িয়ে পড়েন।
এই পরিস্থিতিতে দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। এরপর আরও কঠিন একটি সময়ের মুখোমুখি হয় দলটি।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। অন্যদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তখন লন্ডনে অবস্থান করছিলেন।
দেশের ভেতরে থেকে সেই সময় বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এসে পড়ে মির্জা ফখরুলের ওপর।
রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, আন্দোলন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাকে নিয়মিত সামনে দেখা যায়।
বিভিন্ন সময়ে তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। মামলা ও রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগও তার রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে আছে।
‘ক্লিন ইমেজের’ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও নিয়মিত দেখা যায়।
এই জায়গায় মির্জা ফখরুলকে অনেকটাই ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়।
তার রাজনৈতিক বক্তব্য সাধারণত তুলনামূলকভাবে পরিমিত ও ভদ্র ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের নিয়েও ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলার প্রবণতা তার ভাবমূর্তিকে আলাদা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা দায়িত্ব পালন করলেও তার বিরুদ্ধে অন্য অনেক রাজনীতিকের মতো বড় ধরনের ব্যক্তিগত দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণেই বিএনপির বাইরেও তার একটি অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও থেকে বঙ্গভবন
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রার শুরু হয়েছিল ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতি দিয়ে।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে জেলা রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি, সংসদ এবং মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করেন তিনি।
এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে এসে দীর্ঘ সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
এবার সেই পথচলার শেষ বড় ধাপ হিসেবে তিনি উঠেছেন বঙ্গভবনে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন মির্জা ফখরুল।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়।
তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী এবং রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়েন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
ছাত্রজীবনে রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। নাট্যচর্চা, অভিনয় ও আবৃত্তিতে তার আগ্রহ ছিল।
তার ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও একসময় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে সামনে নতুন দায়িত্ব
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে।
দীর্ঘ সময় বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন নেতার এখন দায়িত্ব বদলে যাচ্ছে। দলীয় রাজনীতির সরাসরি ভূমিকা থেকে তাকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বে যেতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সবার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করা।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব—একাধিক ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা শুধু একটি ব্যক্তির পদোন্নতির গল্প নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ের পরিবর্তন, আন্দোলন, সংকট এবং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গেও তার রাজনৈতিক জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

