২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের যুক্তরাষ্ট্র অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা ছিল জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে কেটি পেরির উদ্বোধনী পারফরম্যান্স শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই বেশি দেখা গেল। অনেক দর্শক এমনকি তার পরিবেশনাকে “বিপর্যয়কর” বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ কেটি পেরি
শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ইউএসএমএনটির ম্যাচ ঘিরে সোফাই স্টেডিয়ামে ৭০ হাজারেরও বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। কেটি পেরির মতো বিশ্বখ্যাত পপ তারকার কাছ থেকে সবাই একটি প্রাণবন্ত ও স্মরণীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আশা করেছিলেন।
কিন্তু দর্শকদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ‘ক্যালিফোর্নিয়া গার্লস’, ‘ফায়ারওয়ার্ক’ কিংবা ‘আই কিসড এ গার্ল’-এর মতো জনপ্রিয় গান পরিবেশনের পরিবর্তে তিনি গেয়েছেন মাত্র একটি গান—‘ওয়ান্ডার’। দুই বছর আগে প্রকাশিত এই গানটি তার পরিচিত হিটগুলোর তুলনায় অনেক কম জনপ্রিয়।
সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় ছিল, ম্যাচ শুরুর মাত্র ১০ মিনিট আগে তিনি মঞ্চে আসেন এবং একটি গান গেয়েই দ্রুত বিদায় নেন।
টিয়াস লুকাই হয়ে উঠলেন অনুষ্ঠানের আসল তারকা
কেটি পেরির সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন ১০ বছর বয়সী নরওয়েজিয়ান কিশোর টিয়াস লুকা। সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাসিক গানগুলোর অসাধারণ কভার গেয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এই শিশু শিল্পী।
অনুষ্ঠান শেষে অনেক দর্শক টিয়াসের কণ্ঠের প্রশংসা করেন। সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য মন্তব্যে দেখা যায়, কেটি পেরির চেয়ে বরং টিয়াস লুকাই দর্শকদের বেশি মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত ছিল এই কিশোরের পরিবেশনা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কেটি পেরিকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা
পারফরম্যান্স শেষ হওয়ার পর এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে সমালোচনার ঢেউ শুরু হয়।
একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “এটি ছিল ভয়াবহ একটি পারফরম্যান্স। তার কণ্ঠ একদম ভালো শোনায়নি।”
আরেকজন তার পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করে বলেন, “পোশাকটা হাস্যকর ছিল।”
কেউ কেউ মজা করে মন্তব্য করেন, কেটি পেরির পোশাক দেখতে মহাকাশযানের মতো লাগছিল। আবার কিছু দর্শক সরাসরি অনুষ্ঠানটিকে “বিরক্তিকর” এবং “হতাশাজনক” বলে মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের আগে তৈরি হয়েছিল বিভ্রান্তি
ম্যাচ শুরুর প্রায় ৯০ মিনিট আগে শুরু হওয়া প্রাক-ম্যাচ আয়োজনে ফিউচার, অনিতা, লিসা, রেমা এবং টাইলা দর্শকদের সামনে প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স উপহার দেন।
প্রথম অংশ শেষ হওয়ার পর মঞ্চ খুলে ফেলা হলে সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে কেটি পেরি হয়তো শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এর ফলে ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে পরে খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম-আপ শেষ হওয়ার পর তিনি মঞ্চে উপস্থিত হন এবং নির্ধারিত সময়ের অল্প আগে তার সংক্ষিপ্ত পরিবেশনা সম্পন্ন করেন।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের উদ্বোধনের সঙ্গে তুলনা
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। সেই আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নানা স্মরণীয় ঘটনার জন্য এখনও আলোচিত।
বিশেষ করে ডায়ানা রসের বিখ্যাত পেনাল্টি মিস এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপস্থিতি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
এর তুলনায় ২০২৬ বিশ্বকাপের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল অনেক বেশি সাদামাটা। কোনো বড় ধরনের নাটকীয় ঘটনা না থাকলেও প্রত্যাশার তুলনায় কম আকর্ষণীয় হওয়ায় দর্শকদের হতাশ করেছে।
কেটি পেরির ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনায়
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান শিল্পী হিসেবে কেটি পেরির নাম ঘোষণার পর থেকেই আলোচনা শুরু হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তাদের একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে দেখা যাওয়ার পর সম্পর্কের গুঞ্জন শুরু হয় এবং পরে দুজনই প্রকাশ্যে সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ফলে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে কেটি পেরির উপস্থিতি নিয়ে কৌতূহলও ছিল অনেক বেশি।
বিশ্বকাপে জমে উঠছে লড়াই
লস অ্যাঞ্জেলেসের ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের চতুর্থ ম্যাচ। এর আগে মেক্সিকো তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারায়।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া পিছিয়ে থেকেও চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে পরাজিত করে। টরন্টোতে কানাডা ও বসনিয়ার ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়।
এরপর ফুটবলপ্রেমীদের নজর যায় যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচের দিকে। কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর দলকে গ্রুপ ‘ডি’-র উদ্বোধনী ম্যাচে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে কেটি পেরির পারফরম্যান্স নিয়ে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। তবে মাত্র একটি গান, সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম উদ্দীপনাময় পরিবেশনা দর্শকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বরং ছোট্ট টিয়াস লুকার পারফরম্যান্সই বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশ্বকাপের যাত্রা এখনো দীর্ঘ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন মাঠের লড়াই এবং বিশ্বসেরা দলগুলোর পারফরম্যান্সের দিকে।

