বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিল যুক্তরাষ্ট্র। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ডি-এর উদ্বোধনী ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত সূচনা করেছে স্বাগতিক ইউএসএ। মাউরিসিও পচেত্তিনোর দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে এবং প্রতিপক্ষকে কার্যত চাপে রেখে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। বিশেষ করে স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের অসাধারণ পারফরম্যান্স ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যেখানে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।
ম্যাচের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়রা প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। মিডফিল্ডে ওয়েস্টন ম্যাকেনি এবং আক্রমণে ফোলারিন বালোগুনের সমন্বয় ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের দ্রুত পাসিং ও সংগঠিত আক্রমণে প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডাররা বারবার সমস্যায় পড়ছিল।
মাত্র সাত মিনিটের মাথায় আসে ম্যাচের প্রথম গোল। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক মুভ থেকে বল পৌঁছে যায় ম্যাকেনির কাছে। এরপর একটি দুর্ভাগ্যজনক মুহূর্তে প্যারাগুয়ের ড্যামিয়ান বোবাদিয়ার গায়ে লেগে বল জালে ঢুকে যায়। আত্মঘাতী এই গোল যুক্তরাষ্ট্রকে প্রাথমিক লিড এনে দেয় এবং ম্যাচের গতি পুরোপুরি তাদের পক্ষে নিয়ে যায়।
প্রথম গোলের পর যুক্তরাষ্ট্র আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ১৬তম মিনিটে সার্জিনো ডেস্ট গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেলেও প্রথম স্পর্শে ভুল করায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়। এরপর কর্নার থেকে গোল না এলেও ম্যাচে একটি উদ্বেগের মুহূর্ত তৈরি হয় যখন সেন্টার-ব্যাক ক্রিস রিচার্ডস হেড করতে গিয়ে ওমর আলদেরেতের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়েন।
কিছুক্ষণ চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবার মাঠে ফিরে আসেন এবং ম্যাচ শেষ পর্যন্ত খেলেন। এই ঘটনা আমেরিকান সমর্থকদের মধ্যে সাময়িক উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও দল তাদের আক্রমণাত্মক মনোভাব বজায় রাখে।
প্রথম হাইড্রেশন বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বালোগুন একবার বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। তবে হতাশ না হয়ে তিনি দ্রুতই নিজের নাম স্কোরশিটে তুলে নেন।
৩১তম মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের নিখুঁত অ্যাসিস্ট থেকে ডানদিকের নিচের কোণায় বল জড়িয়ে ব্যবধান বাড়ান বালোগুন। গোলটি ছিল তার অসাধারণ ফিনিশিং দক্ষতার প্রমাণ।
এরপর বিরতির ঠিক আগে মালিক টিলম্যানের চমৎকার থ্রু পাস ধরে গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে পরাস্ত করে বালোগুন নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এবার তিনি বল পাঠান জালের ওপরের বাম কোণায়, যা ছিল দর্শকদের জন্য এক দৃষ্টিনন্দন মুহূর্ত।
প্রথমার্ধ শেষে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-০। মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য এতটাই স্পষ্ট ছিল যে প্যারাগুয়ের পক্ষে ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ মনে হচ্ছিল।
বিরতির পর কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। দলের অন্যতম তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিককে বিশ্রাম দিয়ে মাঠে নামানো হয় সেবাস্তিয়ান বারহাল্টারকে।
যদিও পুলিসিক মাঠ ছেড়েছিলেন, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ থেমে থাকেনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তারা একাধিক সুযোগ তৈরি করে। তবে প্রথমার্ধের মতো সেগুলোকে গোলের রূপ দিতে পারেনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের গতি কিছুটা কমে আসে এবং আমেরিকান খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্লান্তির ছাপও দেখা যায়। ৭২তম মিনিটে দুই গোলদাতা ফোলারিন বালোগুনের পরিবর্তে রিকার্ডো পেপিকে নামানো হয়। একই সময়ে সার্জিনো ডেস্টের জায়গায় মাঠে আসেন টিমোথি উইয়া।
পরিবর্তনের পর কিছুটা ছন্দ হারায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্যারাগুয়ে ম্যাচে তাদের প্রথম গোলটি আদায় করে নেয়। মাউরিসিওর দুর্দান্ত বাঁ পায়ের শটে বল ডানদিকের নিচের কোণায় জড়িয়ে গেলে স্কোর দাঁড়ায় ৩-১।
এই গোলের পর প্যারাগুয়ে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেও তারা ম্যাচে পুরোপুরি ফিরে আসতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ কয়েকটি মুহূর্তে চাপে পড়লেও সামগ্রিকভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।
ম্যাচ যখন শেষের দিকে, তখনও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ইনজুরি টাইমে জিও রেইনা অসাধারণ দক্ষতায় পায়ের বাইরের অংশ ব্যবহার করে একটি চমৎকার গোল করেন। তার এই নান্দনিক ফিনিশ ম্যাচের ফলাফলকে ৪-১ এ নিয়ে যায় এবং স্বাগতিকদের জয়ে পূর্ণতা এনে দেয়।
রেইনার গোল শুধু জয়ের ব্যবধানই বাড়ায়নি, বরং পুরো দলের আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক মানসিকতারও প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
এই জয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ডও গড়েছে। ১৯৩০ সালের পর এই প্রথম তারা বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ তিন গোলের ব্যবধানে জিততে সক্ষম হলো। দীর্ঘ কয়েক দশকের অপেক্ষার পর এমন একটি অর্জন বিশ্বকাপের শুরুতেই দলটির আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে ফোলারিন বালোগুন, ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক, ওয়েস্টন ম্যাকেনি এবং জিও রেইনার মতো খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে যে এই দলটি শুধু গ্রুপ পর্ব পেরোনোর জন্য নয়, বরং আরও বড় কিছু অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছে।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে এমন দাপুটে পারফরম্যান্সের পর যুক্তরাষ্ট্রকে এখন গ্রুপ ডি-এর অন্যতম ফেভারিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দলটি যদি একই ছন্দ বজায় রাখতে পারে, তাহলে গ্রুপের শীর্ষস্থান দখল করা তাদের জন্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে এমন আত্মবিশ্বাসী জয় শুধু তিনটি পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং পুরো টুর্নামেন্টের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তাও দিয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের এই রাতটি তাই আমেরিকান ফুটবল সমর্থকদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাগতিকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে ছিল এক স্বপ্নের সূচনা।

