বর্তমান যুগে মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা মোটরসাইকেল, গাড়ি কিংবা অন্যান্য আধুনিক যানবাহন। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে এক শিক্ষক যখন ঘোড়ার পিঠে চেপে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা গেছে ঝাড়খণ্ডের গাড়োয়া জেলার তাতিদিরি গ্রামে। সেখানে এক শিক্ষক ঘোড়ায় চড়ে জনগণনার দায়িত্ব পালন করছেন এবং স্থানীয়দের কাছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।
গ্রামের রাস্তায় ঘোড়ার পিঠে একজন শিক্ষককে বাড়ি বাড়ি যেতে দেখে অনেকেই প্রথমে ভেবেছিলেন তিনি হয়তো শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতে বেরিয়েছেন অথবা কোনও শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি কোনও স্কুলের কাজ বা পাঠদানের উদ্দেশ্যে বের হননি। বরং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জনগণনা কার্যক্রম সম্পন্ন করার দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন গ্রামজুড়ে বিভিন্ন পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি ব্যবহার করছেন তাঁর পরিবারের ঘোড়াটিকে।
এই শিক্ষকের নাম মুন্না প্রসাদ গুপ্তা। পেশায় তিনি একজন শিক্ষক হলেও বর্তমানে জনগণনার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সাধারণত এই ধরনের কাজে কর্মীরা মোটরসাইকেল বা অন্যান্য যানবাহন ব্যবহার করেন। কিন্তু মুন্না প্রসাদ বেছে নিয়েছেন এক ভিন্ন পথ।
তাঁর ঘোড়ায় চড়ে কাজ করার দৃশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করেছে। গ্রামের মানুষ যেমন অবাক হচ্ছেন, তেমনি অনেকেই তাঁর এই উদ্যোগকে অভিনব ও বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, আধুনিক যুগে ঘোড়ায় চড়ে জনগণনার কাজ করার প্রয়োজন কী?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মুন্না প্রসাদ নিজেই। তাঁর মতে, ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রল সংগ্রহ করতে অনেক সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কাজেও বিঘ্ন ঘটছে।
এই পরিস্থিতিতে তিনি বিকল্প উপায় হিসেবে পরিবারের বহুদিনের সঙ্গী বাদামি রঙের ঘোড়াটির ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে জ্বালানির ঝামেলা ছাড়াই তিনি সহজে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে পারছেন এবং সময়মতো জনগণনার কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হচ্ছেন।
মুন্না প্রসাদ গুপ্তার পরিবারের সঙ্গে ঘোড়ার সম্পর্ক নতুন নয়। বহু বছর ধরেই তাঁদের পরিবারে ঘোড়া পালনের ঐতিহ্য রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ঘোড়ার প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং তাঁর বাবার কাছ থেকেই ঘোড়ায় চড়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
শৈশবে শেখা সেই দক্ষতাই আজ তাঁর কাজে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে। অন্যদের কাছে যা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, তাঁর কাছে সেটিই একটি স্বাভাবিক এবং কার্যকর যাতায়াতের মাধ্যম।
তাতিদিরি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন ঘোড়ার পিঠে একজন শিক্ষককে জনগণনার কাজে ঘুরে বেড়াতে দেখে বিস্মিত হচ্ছেন। অনেকেই তাঁর সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ কেউ তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসাও করছেন।
বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ঐতিহ্যবাহী পরিবহন ব্যবস্থার এমন ব্যবহার মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। গ্রামবাসীদের মতে, কাজের প্রয়োজনে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে মুন্না প্রসাদ একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সব সমস্যার সমাধান সবসময় আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনও কখনও পুরোনো অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিও কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
মুন্না প্রসাদ গুপ্তার ঘোড়ায় চড়ে জনগণনার কাজ করার ঘটনা শুধু একটি ব্যতিক্রমী গল্প নয়; এটি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ। জ্বালানি সংকট কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার পরিবর্তে তিনি এমন একটি পথ বেছে নিয়েছেন, যা তাঁকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করছে।
ঝাড়খণ্ডের তাতিদিরি গ্রামের শিক্ষক মুন্না প্রসাদ গুপ্তা আজ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে তিনি ঘোড়াকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, প্রয়োজন ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটলে যেকোনও পুরোনো পদ্ধতিও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু স্থানীয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি, বরং আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যকেও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

