মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা এখনও প্রশমিত হয়নি। যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও একের পর এক নতুন পদক্ষেপ ও পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এই শান্তি কতটা টেকসই হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এমন ঘোষণার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ইরান এখন পর্যন্ত বাস্তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেনি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবুও এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় মাঝে মধ্যেই বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে এবং যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু কঠোর মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে সেখানে টোল বা শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ইরানের আলোচনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন বক্তব্য কূটনৈতিক পরিবেশকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে এবং চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই উভয় পক্ষ একে অপরের ধৈর্য ও প্রতিশ্রুতির সীমা পরীক্ষা করছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক ইস্যুতে এখনও দুই দেশের মধ্যে গভীর মতবিরোধ বিদ্যমান।
তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দীর্ঘমেয়াদি একটি পারমাণবিক চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনায় বসেছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, বিরোধ থাকা সত্ত্বেও উভয় দেশ কূটনৈতিক পথকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে চায় না।
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠক স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে শেষ হয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া কূটনীতিকরা জানান, কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে এগিয়েছে।
একজন মার্কিন কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইরানের হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত ঘোষণার পরও আলোচনা থেমে যায়নি। বরং রাতভর প্রায় বিরতিহীনভাবে দর-কষাকষি ও আলোচনার কার্যক্রম চলেছে।
এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান এবং কাতারের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা সামগ্রিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ১৮ ঘণ্টার নিবিড় আলোচনায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে সম্মত হয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও কূটনৈতিক পর্যায়ে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ইরানকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ছাড় দিতে হবে, যা নিয়ে তেহরান এখনও অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে।
এ কারণে আলোচনার অগ্রগতি সত্ত্বেও চুক্তি বাস্তবায়নের পথকে সহজ মনে করছেন না অনেক বিশেষজ্ঞ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান শান্তি উদ্যোগকে সফল করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
প্রথমত, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহকে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ এই নৌপথে কোনো ধরনের বাধা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রকেও উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও পদক্ষেপ যেন কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষ হলেও আলোচনা এখানেই থেমে যাচ্ছে না। দুই দেশের কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা চলতি সপ্তাহজুড়ে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করে বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা চালিয়ে যাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারাবাহিক আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য উভয় পক্ষকে সংযম, ধৈর্য এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে এগোতে হবে। সত্র: অ্যাক্সিওস

