বিশ্বকাপের আগে সাধারণত বড় দলগুলো নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকে। ব্রাজিলও তার ব্যতিক্রম ছিল না। টানা ভালো পারফরম্যান্স, একাধিক গোলদাতা এবং শক্তিশালী স্কোয়াড—সব মিলিয়ে দলটি ছিল দারুণ ছন্দে। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগল। প্রস্তুতি ম্যাচে চোট পেয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলেন তরুণ ডিফেন্ডার ওয়েসলি। এই ঘটনাই এখন চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির জন্য।
বিশ্বকাপের আগে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। দলটি মোট আটটি গোল করেছে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই গোলগুলো এসেছে আটজন ভিন্ন ফুটবলারের পা থেকে। অর্থাৎ, দলের আক্রমণভাগ যেমন ধারালো, তেমনি মিডফিল্ড থেকেও অবদান এসেছে সমানভাবে।
এমন পারফরম্যান্স সাধারণত একটি দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। কোচও নিশ্চিন্ত থাকেন যে, তার দলে বিকল্পের অভাব নেই। কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে এক মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যেতে পারে।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই ম্যাচেই রাইট ব্যাক পজিশনে ওয়েসলিকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন কোচ আনচেলত্তি। কিন্তু ম্যাচ শুরুর মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
হঠাৎ করেই চোট পেয়ে মাঠে বসে পড়েন ওয়েসলি। তার মুখে তখন স্পষ্ট যন্ত্রণার ছাপ। কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকার পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছাড়েন তিনি। এই দৃশ্যটা শুধু দর্শকদের নয়, পুরো দলের মনোবলকেও নাড়িয়ে দেয়।
পরে জানা যায়, তার বাঁ কুঁচকিতে টান লেগেছে, যা তাকে ম্যাচ থেকে বের হতে বাধ্য করে। রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়—এই চোটের কারণে তিনি বিশ্বকাপ থেকেও ছিটকে গেছেন।
ব্রাজিলের স্কোয়াডে প্রায় সব পজিশনেই বিশ্বমানের খেলোয়াড় আছে। কিন্তু ডিফেন্স, বিশেষ করে সাইড ব্যাক পজিশনে তেমন শক্তিশালী বিকল্প নেই। ওয়েসলি সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারতেন বলে মনে করা হচ্ছিল।
তার অনুপস্থিতিতে কোচকে আবারও অভিজ্ঞ দানিলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যদিও দানিলো অভিজ্ঞ, কিন্তু দীর্ঘ টুর্নামেন্টে একজন নির্ভরযোগ্য বিকল্প থাকা খুবই জরুরি। ঠিক এখানেই ব্রাজিলের সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ওয়েসলির পরিবর্তে দলে ডাকা হয়েছে এডারসনকে। তবে নতুন করে দলে ঢোকা একজন খেলোয়াড়ের জন্য বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। সময়ের অভাব, চাপ এবং প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে তার ওপর দায়িত্ব অনেকটাই বেশি।
এটা ঠিক যেন হঠাৎ করে পরীক্ষার আগে নতুন একজন ছাত্রকে ক্লাসে এনে বলা—“এবার তোমাকেই সবার সেরা হতে হবে।” বিষয়টা যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটা নয়।
এরই মধ্যে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকা নেইমারকে নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। লিগামেন্টে গ্রেড-২ চোট থাকা সত্ত্বেও তাকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে। তিনি দলের সঙ্গে বেস ক্যাম্পে থাকলেও আলাদা করে অনুশীলন করছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তিনি কি প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন? বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে তাকে পাওয়া কঠিন। ফলে আক্রমণভাগেও কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে।
মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচে শুরুটা ভালোই করেছিল ব্রাজিল। ব্রুনো গুইমারেজের গোলে এগিয়ে যায় দল। তবে খুব দ্রুতই সমতা ফেরান মিশরের মিডফিল্ডার মোস্তাফা জিকো।
একটা মজার বিষয় হলো—এই জিকোর নামকরণ করা হয়েছে ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার জিকোর নাম অনুসারে। আর সেই জিকোই গোল করলেন ব্রাজিলের বিপক্ষে—যা যেন ফুটবলের এক অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা।
দ্বিতীয়ার্ধে কোচ আনচেলত্তি একসঙ্গে আটটি পরিবর্তন আনেন। তবুও দলের ছন্দে খুব একটা প্রভাব পড়ে না। ম্যাচের শুরুতেই এনড্রিক গোল করে ব্রাজিলকে আবার এগিয়ে দেন, আর শেষ পর্যন্ত সেই গোলই জয়ের ব্যবধান গড়ে দেয়।
যদিও ম্যাচে জয় পেয়েছে ব্রাজিল, কিন্তু ওয়েসলির চোট তাদের জন্য বড় ধাক্কা। একটি দলের জন্য শুধু জেতা নয়, পুরো স্কোয়াডের ফিটনেসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচই চাপের। একের পর এক ম্যাচ খেলতে হয়, যেখানে ছোটখাটো চোটও বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। তাই কোচ আনচেলত্তির এখন সবচেয়ে বড় কাজ হবে—দলের ভারসাম্য ঠিক রাখা এবং খেলোয়াড়দের ফিট রাখা।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ব্রাজিল এখনও শক্তিশালী দল। তাদের আক্রমণভাগ এবং মিডফিল্ড যথেষ্ট ভালো অবস্থায় আছে। তবে ডিফেন্সে এই অনিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের চোট—বিশ্বকাপের আগে তাদের পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ফুটবল সবসময়ই অনিশ্চয়তার খেলা। আজ যে দল ফেভারিট, কাল তার অবস্থাই বদলে যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়—এই চ্যালেঞ্জগুলো সামলে ব্রাজিল আবার আগের মতো ছন্দে ফিরতে পারে কি না।

