নেদারল্যান্ডস বনাম সুইডেন ম্যাচে শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনা, গতি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের এক অসাধারণ প্রদর্শনী। বিশ্বকাপ গ্রুপ ‘এফ’-এর গুরুত্বপূর্ণ এই লড়াইয়ে নেদারল্যান্ডসের হয়ে নায়ক হয়ে ওঠেন ব্রায়ান ব্রবি। ম্যাচের প্রথম ১৭ মিনিটের মধ্যেই দুটি গোল করে তিনি ডাচদের স্বপ্নের সূচনা এনে দেন এবং দলকে জয়ের পথে এগিয়ে দেন।
ম্যাচের আগে নেদারল্যান্ডসের প্রথম একাদশে ব্রায়ান ব্রবির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থক মনে করেছিলেন, তার পরিবর্তে অন্য কোনো ফরোয়ার্ডকে সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মাঠে নেমে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন এই তরুণ স্ট্রাইকার।
প্রথম থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেন ব্রবি। গোলের সামনে তার ক্ষিপ্রতা, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ফিনিশিং দক্ষতা ছিল অসাধারণ। মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে দুটি গোল করে তিনি সুইডেনের রক্ষণভাগকে পুরোপুরি চাপে ফেলে দেন।
ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সুইডেনের দুই তারকা ফরোয়ার্ড ভিক্টর গিওকেরেস এবং আলেকজান্ডার ইসাক। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই জুটি নেদারল্যান্ডসের রক্ষণভাগে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রায়ান ব্রবি নিজের শক্তিশালী হোল্ড-আপ প্লে এবং নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেন। নেদারল্যান্ডসের আক্রমণ ছিল ধারালো, আর সুইডেন মাঝমাঠে বলের দখল রাখতে ব্যর্থ হয়।
একসময় ডাচ কিংবদন্তি মার্কো ভ্যান বাস্তেন ব্রবির কারিগরি দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে এই ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখে সেই মূল্যায়ন নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটে নেদারল্যান্ডস যেন ঝড় তুলেছিল। তারা শুধু দুটি গোলই করেনি, বরং আরও কয়েকটি সুযোগও তৈরি করেছিল। মনে হচ্ছিল স্কোরলাইন আরও বড় হতে পারে।
তবে হাইড্রেশন ব্রেকের পর ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। সুইডেন ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায় এবং ডাচদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। একের পর এক আক্রমণে তারা গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছালেও ভাগ্য তাদের পক্ষে ছিল না।
সুইডেন ম্যাচে ফিরতে পারেনি মূলত নেদারল্যান্ডস গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেনের অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে। ম্যাচজুড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে তিনি দলের লিড অক্ষুণ্ণ রাখেন।
ইয়াসিন আয়ারির নিচু শট কর্নারের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু ভারব্রুগেন অসাধারণ দক্ষতায় বলটি প্রতিহত করেন। তার প্রতিটি সেভ সুইডিশ খেলোয়াড়দের হতাশ করে তোলে।
সুইডেনের ভিক্টর গিওকেরেস ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। আক্রমণভাগে তিনি নিয়মিত হুমকি তৈরি করছিলেন। ড্রিবলিং, পাসিং এবং অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়।
একটি চমৎকার ফ্রি-কিক থেকে তিনি গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। বলটি নিচের কর্নারের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু আবারও বাধা হয়ে দাঁড়ান ভারব্রুগেন। গোল না পেলেও গিওকেরেসের পারফরম্যান্স সুইডেনের আক্রমণভাগকে প্রাণবন্ত রেখেছিল।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে সুইডেন অবশেষে জালের দেখা পেয়েছিল বলে মনে হয়। গুস্তাফ লাগারবিয়েলকে একটি নিখুঁত ফ্রি-কিক থেকে হেড করে বল জালে পাঠান।
মুহূর্তের জন্য সুইডিশ সমর্থকদের মধ্যে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু রেফারির পতাকা উঠে যায়। রিপ্লেতে দেখা যায়, শুধু গোলদাতা নন, আরও কয়েকজন সুইডিশ খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে ছিলেন। ফলে গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
নেদারল্যান্ডস শুধু রক্ষণে নয়, আক্রমণেও ছিল সমান কার্যকর। কোডি গাকপো তার স্বাভাবিক স্টাইলে বারবার ডান ও বাম দিক থেকে আক্রমণ গড়ে তোলেন।
একটি দারুণ ক্রসে ডেনজেল ডামফ্রিস গোলের সুযোগ পেলেও অল্পের জন্য বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি। পরে ডনিয়েল মালেন ডান দিক থেকে বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করেন, তবে তার প্রচেষ্টা পোস্টের বাইরে চলে যায়।
গাকপো নিজের পরিচিত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে দূরপাল্লার শটও নেন, যদিও সেটি সহজেই আটকান সুইডেন গোলরক্ষক।
হাইড্রেশন ব্রেকের পর সুইডেন যেন নতুন রূপে মাঠে নামে। তাদের পাসিং ছিল অনেক বেশি সংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল সরিয়ে তারা নেদারল্যান্ডসের রক্ষণে চাপ বাড়ায়।
আলেকজান্ডার ইসাক ও ভিক্টর গিওকেরেসের সমন্বয়ে বেশ কয়েকটি আক্রমণ তৈরি হয়। গিওকেরেসের বাঁকানো শট দর্শকদের উত্তেজিত করলেও গোলরক্ষকের দক্ষতায় তা প্রতিহত হয়।
পুরো ম্যাচজুড়ে ছিল আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের লড়াই। অনেকটা বাস্কেটবল ম্যাচের মতো এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত গতিতে খেলা চলছিল। ইয়াসিন আয়ারির দূরপাল্লার শট অল্পের জন্য বারের ওপর দিয়ে চলে যায়, যা সুইডেনের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।
নেদারল্যান্ডস প্রথম দিকে আধিপত্য বিস্তার করলেও সুইডেন শেষভাগে দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে গোলের সামনে ব্যর্থতা এবং প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাদের ম্যাচে ফেরার সুযোগ নষ্ট করে।
হিউস্টনের এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের জয়ের ভিত্তি গড়ে দেন ব্রায়ান ব্রবি। তার দ্রুত দুটি গোল ডাচদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। অন্যদিকে সুইডেন সুযোগ তৈরি করেও গোল না পাওয়ার আক্ষেপে ভুগেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই পারফরম্যান্স নেদারল্যান্ডসকে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। আর ব্রায়ান ব্রবি প্রমাণ করেছেন, বড় ম্যাচে বড় তারকার মতোই নিজেকে তুলে ধরতে তিনি প্রস্তুত।

