নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি ল্যাম্পপোস্ট। দিনের ব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যা নামলেই সেই আলো হয়ে ওঠে সাত বছরের শিশু নিরবের পাঠশালা। যখন অধিকাংশ শিশু ঘরের উজ্জ্বল আলোয় পড়াশোনা করে, তখন নিরব বই-খাতা হাতে ছুটে আসে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। কারণ তার ঘরে নেই বিদ্যুতের সুবিধা। কুপির তেল শেষ হয়ে গেলে ল্যাম্পপোস্টের আলোই হয়ে ওঠে তার একমাত্র ভরসা। আর সেই আলোয় প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয় তার স্বপ্ন একদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন আর্মি অফিসার হয়ে মায়ের সব কষ্ট দূর করবে।
নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের পাশে একটি ছোট্ট ঘরে বসবাস করেন নিরব ও তার মা রুপসানা বেগম। জীবনের শুরু থেকেই নিরবকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। মাত্র ১৬ মাস বয়সে বাবাকে হারায় সে। বাবা অন্যত্র বিয়ে করে চলে যাওয়ার পর থেকেই পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার মায়ের কাঁধে।
বর্তমানে বড় ভাই রিফাত ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। তার সামান্য আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। এই আয়ই পরিবারটির একমাত্র অবলম্বন। সীমিত আয়ে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই যেখানে কঠিন, সেখানে উন্নত জীবনযাত্রা কিংবা ভালো শিক্ষার সুযোগ অনেক দূরের বিষয়।
রুপসানা বেগম দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। অনেক সময় পরিবারের তিনবেলার খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। মাছ-মাংস তাদের কাছে প্রায় বিলাসিতার মতো।
তবুও তিনি সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে কখনো হাল ছাড়েননি। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় নিরবকে একটি মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছেন এবং নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অভাবের মধ্যেও ছেলের শিক্ষাই তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
অভাব-অনটন নিরবের স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিদিনের সংগ্রাম তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরব বলে, “আমার মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেন। আমি বড় হয়ে আর্মি অফিসার হতে চাই। মায়ের সব কষ্ট দূর করতে চাই।”
শিশুটির এই সরল কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয় তার বয়সের তুলনায় অনেক বড় একটি মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়। নিজের জন্য নয়, বরং মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যই তাকে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মনোযোগী করে তুলছে।
রুপসানা বেগমের স্বপ্নও ছেলেকে ঘিরেই। তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু তাকে ভালোভাবে পড়ানোর মতো সামর্থ্য নেই। মানুষের সহযোগিতায় তাকে পড়াচ্ছি। সে আর্মি অফিসার হোক বা অন্য কিছু, একজন ভালো মানুষ হোক এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।”
তিনি আরও জানান, মাদরাসার শিক্ষকরাও নিরবকে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
নিরবের পড়াশোনার প্রতি নিষ্ঠা স্থানীয় মানুষের নজর এড়ায়নি। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই তাকে স্টেশনের আলোয় বসে পড়তে দেখা যায়। এই দৃশ্য এখন এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মিরাজ হোসেন বলেন, “আমরা প্রায়ই রাতে এখানে ক্রিকেট খেলি। প্রতিদিন দেখি নিরব ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়ছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনার প্রতিই তার আগ্রহ অনেক বেশি।”
আরেক বাসিন্দা হোসাইন বাবুর মতে, “নিরব অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু পরিবারটি খুবই অসহায়। তার মা একাই সব দায়িত্ব পালন করছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে এই শিশুটি অনেক দূর যেতে পারবে।”
স্থানীয়দের মতে, নিরব শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থীই নয়, বরং অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব শুধু নিরবের শিক্ষাজীবনেই নয়, তার শারীরিক বিকাশেও পড়ছে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে সে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। চিকিৎসা, পুষ্টি এবং শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকলে ভবিষ্যতে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে একসময় নিরবের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিঠুন রায় প্রতিদিন নিরবকে স্টেশনের আলোয় পড়তে দেখেন। তিনি বলেন, “সন্ধ্যা হলেই ছেলেটি বই নিয়ে স্টেশনে চলে আসে। তার শেখার আগ্রহ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। পারিবারিক সংকট না থাকলে তাকে এখানে এসে পড়তে হতো না। সমাজের মানুষ যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই শিশুটি একদিন অবশ্যই ভালো কিছু করবে।”
তার মতে, নিরবের মধ্যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক সুযোগ ও সহায়তা।
নিরবের গল্প কেবল একটি দরিদ্র পরিবারের সংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। বিদ্যুৎহীন ঘর, অসুস্থ মা, অর্থকষ্ট এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও সে প্রতিদিন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বসে নিজের স্বপ্নকে লালন করছে।
একটি শিশুর মেধা যেন শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে হারিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা সমাজেরও দায়িত্ব। শিক্ষা, পুষ্টি এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেলে নিরব শুধু নিজের জীবনই বদলাবে না, ভবিষ্যতে সমাজের জন্যও একজন যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারবে।
নিরবের মতো হাজারো শিশুর স্বপ্ন টিকে থাকে মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা, সচেতনতা এবং ভালোবাসার ওপর। তাই সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ আলোকে একদিন সাফল্যের উজ্জ্বল আলোয় পরিণত করতে।

