খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeমেডিকেল জার্নালগর্ভেই বদলে যাচ্ছে শিশুর জিন! বায়ুদূষণ নিয়ে ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা দিল এমস

গর্ভেই বদলে যাচ্ছে শিশুর জিন! বায়ুদূষণ নিয়ে ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা দিল এমস

বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত পরিবেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে অন্তঃসত্ত্বা নারীর উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।

বায়ুদূষণ যে শুধু মানুষের ফুসফুস বা শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি করছে, এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, দূষিত বাতাসের ক্ষতিকর প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর শরীরেও। এমনকি গর্ভস্থ ভ্রূণের জিনের কার্যকারিতা এবং স্বাভাবিক বিকাশও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এমস)-এর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বায়ুদূষণের সূক্ষ্ম বিষাক্ত কণা শুধু মায়ের শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং প্লাসেন্টার মাধ্যমে ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে শিশুর মস্তিষ্ক, ফুসফুস, যকৃত এবং জিনগত বিকাশের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি মায়ের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি সংগ্রহ করে ভ্রূণের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু গবেষকদের মতে, বাতাসে থাকা অতিসূক্ষ্ম দূষিত কণা, বিশেষ করে পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০, সহজেই মায়ের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে প্লাসেন্টা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

এই ক্ষতিকর কণাগুলি প্লাসেন্টায় জমা হওয়ার পর ভ্রূণের শরীরেও প্রবেশ করে। ফলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও অঙ্গ গঠনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের ক্ষতিকর কণা অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন :  টাইপ ১ নয়, টাইপ ৫ ডায়াবেটিস:ভুল চিকিৎসায় কেন বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি?

গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের প্রভাবে আইজিএফবিপি৩ (IGFBP3) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এই জিন শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, কোষের বিকাশ এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যখন এই জিন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন গর্ভের মধ্যেই শিশুর বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়। ফলে জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হওয়া বা শারীরিক বিকাশে সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

দূষিত কণাগুলি প্লাসেন্টার রক্তনালির স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে মায়ের শরীর থেকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি ভ্রূণের শরীরে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয়।

এই পরিস্থিতিতে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ঘাটতি দেখা দেয়, যা তার সামগ্রিক বৃদ্ধি ও অঙ্গ গঠনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। দূষণের বিষাক্ত কণাগুলি এই স্নায়বিক বিকাশে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

ফলে শিশুর মধ্যে ভবিষ্যতে শেখার সমস্যা, আচরণগত পরিবর্তন, বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা কিংবা বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে দূষিত পরিবেশে বসবাস করলে গর্ভস্থ শিশুর নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বায়ুদূষণের প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশুর জন্ম হতে পারে। অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের নানা স্বাস্থ্য জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আরও পড়ুন :  কোলেস্টেরল কমাতে নতুন ওষুধ! কীভাবে কাজ করে, কারা খেতে পারবেন?

পর্যাপ্ত পুষ্টি ও অক্সিজেনের অভাবে শিশুর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুদের ভবিষ্যতে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।

জন্মের পরপরই শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরবর্তী জীবনে হাঁপানি, সিওপিডি এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে জন্মগত শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটলে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বায়ুদূষণের ক্ষতি শুধু গর্ভস্থ শিশুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মায়ের শরীরেও এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত পরিবেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে অন্তঃসত্ত্বা নারীর উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।

এছাড়া গর্ভপাতের সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে। তাই গর্ভবতী নারীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

ইঁদুরের উপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় দূষণের সংস্পর্শে আসা ভ্রূণ পরবর্তী জীবনে নানা ধরনের স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন :  অ্যান্ড্রোপজ কী? পুরুষদের জীবনের নীরব পরিবর্তন, লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার

গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এসব প্রাণীর মধ্যে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, আচরণগত পরিবর্তন এবং শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বায়ুদূষণ ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এর প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও বিকাশের উপরও পড়ছে।

এমসের বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—বায়ুদূষণকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জনস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য এবং নবজাতকের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুতর সংকট।

বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে নতুন গবেষণা ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। দূষিত বাতাসের সূক্ষ্ম কণা গর্ভস্থ শিশুর জিন, মস্তিষ্ক, ফুসফুস এবং সামগ্রিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদেরও নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং গর্ভবতী নারীদের দূষণ থেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। এতে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও একটি সুস্থ ও নিরাপদ জীবন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।