যে জমিতে একসময় গাছ জন্মানোর কথা কল্পনাও করা যেত না, সেই বিস্তীর্ণ নোনা মাটির প্রান্তর আজ ধীরে ধীরে সবুজে ঢেকে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে অনুর্বর ও লবণাক্ত হিসেবে পরিচিত এই ভূমি এখন পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের এক নতুন উদাহরণ হয়ে উঠছে। বিশেষ একটি উদ্ভাবনী কৃষি-পদ্ধতির মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে গুজরাটের ধোলেরা অঞ্চল।
একসময় যেখানে শুধু ধুধু খালি মাঠ দেখা যেত, সেখানে এখন সারি সারি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবেশবিদদের মতে, এই সাফল্য ভবিষ্যতে বৃহৎ আকারের সবুজায়ন প্রকল্পের পথ খুলে দিতে পারে।
গুজরাটের আমেদাবাদ জেলার ধোলেরা অঞ্চলের একটি বড় অংশের জমিতে লবণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। এই ধরনের মাটিতে সাধারণত গাছের চারা বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। অতীতে বহুবার বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যর্থ হয়েছে।
মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা, জৈব উপাদানের অভাব এবং দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল গাছের বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি ও প্রাণহীন অবস্থায় পড়ে ছিল।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে একটি অভিনব প্রযুক্তির মাধ্যমে। ধোলেরা স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট রিজিয়নের অ্যাক্টিভেশন এরিয়ার ২৯ নম্বর ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় ‘ড্রাম প্লান্টেশন’ পদ্ধতি।
২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ২০০টি চারা রোপণ করা হয়। অবাক করার বিষয় হলো, মাত্র এক বছরের মধ্যেই অনেক গাছের উচ্চতা ১২ ফুট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যা এই অঞ্চলের জন্য এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ড্রাম প্লান্টেশন এমন একটি বিশেষ প্রযুক্তি যেখানে সরাসরি নোনা মাটিতে চারা রোপণ করা হয় না। পরিবর্তে একটি প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করা হয়, যা গাছের জন্য কৃত্রিমভাবে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে।
প্রতিটি ড্রামের ভেতরে নির্দিষ্ট অনুপাতে বালি, উর্বর মাটি, জৈব সার, নারকেলের ছোবড়া এবং শুকনো ঘাস মেশানো হয়। এরপর সেই মিশ্রণের মধ্যে চারা রোপণ করা হয়।
চারা বসানোর পর ড্রামগুলোকে প্রায় এক ফুট গভীর করে নোনা জমির মধ্যে স্থাপন করা হয়। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ড্রামগুলো বসানো হয় যাতে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত জায়গা ও পুষ্টি পেতে পারে।
এই ব্যবস্থার ফলে চারাগাছ সরাসরি লবণাক্ত মাটির সংস্পর্শে আসে না এবং প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও আর্দ্রতা পায়।
ধোলেরার জমিতে লবণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। পাশাপাশি মাটিতে কার্বনের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। এর ওপর বছরে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত জল জমে থাকে, যা সাধারণ গাছের বৃদ্ধির জন্য বড় বাধা।
ড্রাম প্লান্টেশন পদ্ধতি এসব সমস্যার অনেকটাই দূর করেছে। ড্রামের ভেতরে তৈরি করা বিশেষ মিশ্রণ চারাগাছকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে শিকড়কে লবণাক্ত মাটির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়।
ফলে চারাগাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম হয়। এই প্রযুক্তির মূল সাফল্য এখানেই।
ধোলেরা অঞ্চলে বৃহৎ পরিসরে নগর উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ড্রাম প্লান্টেশন প্রকল্পের সফলতা প্রশাসনকে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। যদি একই পদ্ধতি বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই বিস্তীর্ণ নোনা জমি সবুজ বেষ্টনীতে পরিণত হতে পারে।
এতে একদিকে যেমন পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে বায়ুদূষণ কমানো, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নোনা ও অনুর্বর জমিতে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে ড্রাম প্লান্টেশন একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে। ধোলেরার অভিজ্ঞতা শুধু গুজরাট নয়, বিশ্বের অন্যান্য লবণাক্ত অঞ্চলের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
যে ভূমি একসময় অনুর্বরতার প্রতীক ছিল, আজ সেই মাটিতেই জন্ম নিচ্ছে হাজারো গাছ। ড্রাম প্লান্টেশন পদ্ধতির এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে প্রকৃতির কঠিন বাধাকেও জয় করা সম্ভব।
ধোলেরার নোনা মাটিতে শুরু হওয়া এই সবুজ বিপ্লব ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।

