Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবাংলা নিউজরাজধানী‘বাথরুমে বোনের কাটা মাথা দেখি’— আদালতে কাঁদাল রামিসার বোনের জবানবন্দি

‘বাথরুমে বোনের কাটা মাথা দেখি’— আদালতে কাঁদাল রামিসার বোনের জবানবন্দি

আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে রাইসা জানান, ঘটনার দিন সকালে মায়ের নির্দেশে তিনি চাচার বাসায় গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলে মা তাকে জিজ্ঞেস করেন, রামিসা কোথায়। তখন তিনি জানান, ছোট বোন তার সঙ্গে যায়নি।

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারিক কার্যক্রম নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঢাকার শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়েছে। শুনানির সময় আদালতে উঠে আসে এমন কিছু তথ্য, যা উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়। বিশেষ করে নিহত শিশুর বড় বোন রাইসা আক্তারের সাক্ষ্য মামলাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তোলে।

বুধবার সকাল প্রায় ১১টা ৫০ মিনিটে বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু প্রথমে আদালতের সামনে মামলার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। তিনি আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন এবং মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে একে একে সাক্ষীদের জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মধ্যেই সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের বক্তব্য।

আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে রাইসা জানান, ঘটনার দিন সকালে মায়ের নির্দেশে তিনি চাচার বাসায় গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলে মা তাকে জিজ্ঞেস করেন, রামিসা কোথায়। তখন তিনি জানান, ছোট বোন তার সঙ্গে যায়নি।

রাইসা বলেন, রামিসা প্রায়ই ভবনের নিচে নেমে বিড়ালের সঙ্গে খেলত। তাই তিনি ধারণা করেছিলেন, হয়তো নিচে গেছে। কিন্তু খোঁজাখুঁজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি।

খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে রামিসার মা আসামি সোহেল রানার বাসার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। এরপর বারবার দরজায় ডাকাডাকি করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পরে রামিসার বাবা, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেই মুহূর্তের স্মৃতি তুলে ধরে রাইসা আদালতে বলেন, ভেতরে ঢোকার পর বাথরুমে বোনের বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তিনি। সেই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে যান।

তিনি আরও জানান, পরে জানতে পারেন যে আসামি সোহেল রানা তার ছোট বোনকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে।

শুনানির সময় আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার অসুস্থ হয়ে পড়েন। আদালত সূত্রে জানা যায়, তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর পুনরায় কাঠগড়ায় আনা হয়।

শুনানির একপর্যায়ে স্বপ্না আক্তার হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে সোহেল রানার দিকে এগিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি তাকে আঘাত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

এ সময় বিচারক উভয় আসামিকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আগের দিন তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য শোনা হয়েছে এবং সেদিন রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার পালা। আদালতের নির্দেশের পর স্বপ্না আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এর আগে টানা ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তারসহ অন্যান্য সাক্ষীর বক্তব্যে ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সাক্ষীরা জানান, ঘটনার দিন সকাল থেকে শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আসামির বাসার সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পেয়ে তাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, রামিসা ছিল পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে বাসা থেকে বের হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আসামি স্বপ্না আক্তার কৌশলে শিশুটিকে নিজের বাসার ভেতরে নিয়ে যান।

এর কিছুক্ষণ পর স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেলেও রামিসাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মা-বাবা এবং প্রতিবেশীরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

অবশেষে আসামির ঘরের সামনে শিশুটির একটি স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। দরজা না খোলায় স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়।

ঘরে ঢুকে সবাই যে দৃশ্য দেখেন, তা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। সোহেল রানার শোবার ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ। আর বাথরুমের একটি বড় বালতির ভেতরে পাওয়া যায় তার বিচ্ছিন্ন মাথা।

এই ঘটনা মুহূর্তেই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।

ঘটনার পরপরই স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তে ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

মামলার তদন্ত চলাকালে গত ২০ মে আদালতে হাজির হয়ে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি চলছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে নিহত রামিসার পরিবারসহ পুরো দেশ।

রামিসা হত্যা মামলা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ও মর্মান্তিক শিশু হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালতে উঠে আসা প্রত্যেকটি তথ্য ও সাক্ষ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোক এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা, বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং অপরাধীরা আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।