বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যশোরের বেনাপোল সীমান্তে একদল মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে ওই ব্যক্তিদের সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা জিরো লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ঘটনাকে ঘিরে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পুশ-ইনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে, তবুও সীমান্তজুড়ে নজরদারি আরও জোরদার করেছে বিজিবি।
স্থানীয় সূত্র এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার গভীর রাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ প্রায় ১৫ জনের একটি দলকে যশোরের বেনাপোল উপজেলার রঘুনাথপুর ও সাদীপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে।
খবর পাওয়ার পর বিজিবি দ্রুত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেননি এবং জিরো লাইনের কাছাকাছি অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
পরিস্থিতি নিয়ে পরদিন বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠকে বিএসএফ নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বলে বিজিবি সূত্র জানিয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এটি ছিল একটি নিয়মিত সীমান্ত বৈঠক এবং পুশ-ইনের কোনও ঘটনা ঘটেনি।
সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করা ব্যক্তিদের সরাসরি দেখা না গেলেও তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী মঙ্গলবার পর্যন্ত ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিজিবির দাবি অনুযায়ী, ওই দলে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছে যে সীমান্তের ওপারে আনুমানিক ১০০ জন মানুষকে একত্রিত করা হয়েছিল।
রঘুনাথপুর বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল আলম খান জানান, সীমান্তে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করা হলেও বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কাউকে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং জিরো লাইন অতিক্রমের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, সীমান্তে আটকে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তার বাবাও রয়েছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার বাবা কয়েক বছর আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন এবং পরে আর দেশে ফিরতে পারেননি। সম্প্রতি তাকে অন্যান্যদের সঙ্গে সীমান্তে নিয়ে আসা হয়েছে।
নজরুল ইসলামের দাবি, তার বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছে এবং তিনি জানিয়েছেন যে তাদের দলে প্রায় ৬০ জনের মতো মানুষ ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন পথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকায় সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
তিনি জানান, যদি ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে কোনও তালিকা পাঠায়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান রিপ্যাট্রিয়েশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের কোনও তালিকা পায়নি। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে দেন যে বাংলাদেশ অবৈধ পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
শুধু বেনাপোল নয়, সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। ভারতের হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় কয়েকশ কথিত বাংলাদেশি জড়ো হয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।
তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ব্যক্তিকে সীমান্তে অবস্থান করতে না দিয়ে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
এর আগে সাতক্ষীরা সীমান্তে পুশ-ব্যাক নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর থেকেই ওই অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বেনাপোল এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ এই সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর।
সাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন জানান, অতীতে সীমান্ত দিয়ে গোপনে যাতায়াতের ঘটনা থাকলেও বেনাপোল সীমান্তে এ ধরনের পুশ-ইনের অভিযোগ খুবই বিরল।
তার মতে, বন্দরকেন্দ্রিক কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলে সীমান্ত অতিক্রম করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাটি স্থানীয়দের জন্যও অস্বাভাবিক।
ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশি সন্দেহে অভিযান জোরদার হওয়ার পর থেকেই সীমান্তে পুশ-ব্যাক ও পুশ-ইন ইস্যু নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভারতের দৃষ্টিতে যেটি পুশ-ব্যাক, বাংলাদেশের কাছে সেটিই পুশ-ইন হিসেবে বিবেচিত হয়। গত এক বছরে খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।
সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ ও সমন্বয়ের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে। কারণ পরিচয় যাচাই, নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং বৈধ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে মানবিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বেনাপোল সীমান্তের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি শুধু একটি সীমান্ত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, অভিবাসন নীতি এবং মানবাধিকার প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। বিজিবির কঠোর অবস্থানের ফলে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগকৃত প্রচেষ্টা আপাতত ব্যর্থ হলেও জিরো লাইনে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এখন নজর থাকবে দুই দেশের সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সমস্যার সমাধান করা গেলে সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

