প্রযুক্তি জগতে অ্যাপল সবসময়ই নতুন কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু সব পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয় না। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাপলের হেড-মাউন্টেড ডিভাইস বা মাথায় পরার প্রযুক্তি নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে। নতুন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া জন টার্নাস এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে জানা যাচ্ছে।
অ্যাপল ভিশন প্রো: বড় স্বপ্ন, সীমিত বাস্তবতা
অ্যাপল ভিশন প্রো শুরুতে এমন একটি ডিভাইস হিসেবে ভাবা হয়েছিল, যা ভবিষ্যতের নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি স্মার্টফোনের মতোই আরেকটি বিপ্লব ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
ডিভাইসটি প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী হলেও, ব্যবহারকারীদের জন্য এমন কোনো “অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে” ধরনের অ্যাপ তৈরি হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের আগ্রহও তেমন তৈরি হয়নি। দামও ছিল অনেক বেশি, যা বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর নাগালের বাইরে।
বাতিল হচ্ছে একের পর এক প্রজেক্ট
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপল এখন তাদের আগের পরিকল্পনা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। আগে যেখানে একাধিক হেডসেট ও স্মার্ট গ্লাস বাজারে আনার পরিকল্পনা ছিল, এখন তা কমিয়ে আনা হয়েছে।
বিশেষ করে “ভিশন এয়ার” নামে একটি হালকা ও তুলনামূলক সস্তা হেডসেট প্রজেক্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে “ডিসপ্লে গ্লাস” প্রকল্পও বাতিল করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তগুলো হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। বরং অনেক আগে থেকেই অ্যাপলের ভেতরে এই পরিবর্তনের পরিকল্পনা চলছিল।
স্মার্ট গ্লাসেই ভবিষ্যৎ দেখছে অ্যাপল
এখন অ্যাপলের মূল ফোকাস চলে গেছে স্মার্ট গ্লাসের দিকে। কারণ এখানে বড় বাজারের সম্ভাবনা রয়েছে। ভাবুন, হাজার হাজার মানুষ যারা চশমা ব্যবহার করেন—তারা যদি একটু বাড়তি টাকা দিয়ে AI সুবিধাসম্পন্ন চশমা কিনতে পারেন, তাহলে বিক্রি অনেক দ্রুত বাড়বে।
অন্যদিকে, কয়েক হাজার ডলারের একটি হেডসেট কেনার মতো ক্রেতা খুব সীমিত। তাই ব্যবসার দিক থেকে স্মার্ট গ্লাস অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত।
সামনে কী আসছে?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপল এখন দুটি ধরনের স্মার্ট গ্লাস নিয়ে কাজ করছে।
প্রথমটি হবে AI-ভিত্তিক স্মার্ট গ্লাস, যা ২০২৭ সালের দিকে বাজারে আসতে পারে। এটি অনেকটা সাধারণ চশমার মতো হলেও এতে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা।
দ্বিতীয়টি আরও উন্নত “অ্যাপল গ্লাস”, যা পুরোপুরি অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। এটি সম্ভবত দশকের শেষের দিকে বাজারে আসবে।
ভিশন প্রো আপডেট: অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ভিশন প্রোর পরবর্তী সংস্করণ নিয়ে কাজ চলছে, তবে সেটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। পুরো ক্যাটাগরিটিই কিছুটা স্থবির অবস্থায় আছে। অর্থাৎ, অ্যাপল আপাতত এই দিকটিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।
কেন এই পরিবর্তন?
এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, উচ্চ দাম। সাধারণ মানুষ এত দামী ডিভাইস কিনতে আগ্রহী নয়।
দ্বিতীয়ত, ব্যবহারিক প্রয়োজনের অভাব। এমন কোনো অ্যাপ বা ফিচার নেই যা ব্যবহারকারীকে বাধ্য করবে এটি কিনতে।
তৃতীয়ত, ডেভেলপারদের আগ্রহ কম। যখন ব্যবহারকারী কম থাকে, তখন অ্যাপ ডেভেলপাররাও নতুন কিছু তৈরি করতে আগ্রহী হয় না। ফলে একটি “চক্র” তৈরি হয়—অ্যাপ নেই বলে মানুষ কিনছে না, আর মানুষ কিনছে না বলে অ্যাপও তৈরি হচ্ছে না।
নতুন প্রতিযোগিতা: শুধু গ্লাস নয়
মজার বিষয় হলো, স্মার্ট গ্লাসই একমাত্র ভবিষ্যৎ নয়। অ্যাপল আরও কিছু বিকল্প নিয়েও কাজ করছে।
যেমন, ক্যামেরাসহ এয়ারপডস প্রো—যা একই ধরনের AI অভিজ্ঞতা দিতে পারে, কিন্তু চশমা পরার প্রয়োজন হবে না।
এছাড়া, ছোট পরিধানযোগ্য ডিভাইস যেমন AI পিন বা পেনডেন্ট নিয়েও গবেষণা চলছে। এগুলো খুব ছোট হলেও স্মার্ট ফিচার দিতে সক্ষম হবে।
অ্যাপলের কৌশল: সহজ অভিজ্ঞতার দিকে ঝোঁক
সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, অ্যাপল এখন এমন ডিভাইস তৈরি করতে চায় যা সহজ, ব্যবহারবান্ধব এবং সবার জন্য গ্রহণযোগ্য।
বড়, ভারী হেডসেটের বদলে ছোট, হালকা এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য ডিভাইসই তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
শেষ কথা
প্রযুক্তির জগতে পরিবর্তন খুব স্বাভাবিক বিষয়। অ্যাপলও তার ব্যতিক্রম নয়। তারা বুঝতে পেরেছে, শুধু নতুন প্রযুক্তি বানালেই হবে না—সেটি মানুষের জীবনে কতটা কাজে লাগে, সেটিই আসল বিষয়।
সেই কারণেই এখন তারা স্মার্ট গ্লাস ও AI-ভিত্তিক ছোট ডিভাইসের দিকে বেশি মন দিচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এমন প্রযুক্তি দেখব, যা চোখে পড়ার মতো নয়, কিন্তু আমাদের জীবন অনেক সহজ করে দেবে।
এখন দেখার বিষয়, অ্যাপলের এই নতুন কৌশল কতটা সফল হয়।

