বাংলাদেশে আবারও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রাহক এবং পাইকারি—উভয় পর্যায়েই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দ্রুত সময়ের মধ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন ঘোষিত মূল্যহার অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।
বিইআরসির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্য নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষ করে লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
নতুন হিসাব অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে কিছু গ্রাহক শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে মাসিক বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যও বড় ধরনের সমন্বয়ের আওতায় আনা হয়েছে। আগে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ৭ দশমিক ০৪ টাকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা বৃদ্ধি পেয়ে গড়ে ৮ দশমিক ৩৯ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
পাইকারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পরবর্তীতে গ্রাহক পর্যায়ের বিদ্যুৎ বিলেও প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু বিদ্যুতের মূল দামই নয়, সঞ্চালন খরচও বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন চার্জ ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশের হিসেবে এই বৃদ্ধি প্রায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার মোট ব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দাবি, উৎপাদন ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের ভিত্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ দশমিক ৯১ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ মোকাবিলার অংশ হিসেবেই নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন খরচ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে কমিশন বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যহার নির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছে।
বিইআরসি বলছে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এটি বিদ্যুতের দামে সাম্প্রতিক সময়ের প্রথম বৃদ্ধি নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
একাধিক ধাপে মূল্য বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। কারণ বিদ্যুৎ শুধু গৃহস্থালি খরচ নয়, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি এবং সেবা খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে সামগ্রিক বাজারমূল্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন বিদ্যুৎ মূল্যহার ঘোষণার পর সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিদ্যুতের বাড়তি খরচের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প ছিল না। তবে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব আগামী মাসগুলোতে বিদ্যুৎ বিল এবং বাজার পরিস্থিতির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ২০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও, এর ফলে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন সবার নজর থাকবে এই মূল্য সমন্বয় বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা এবং সেবার মান উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে তার ওপর।

