উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে আবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে বহু শতাব্দী পুরোনো ঐতিহ্যবাহী তিমি শিকার উৎসব। এই শিকারে শত শত পাইলট তিমি নিহত হওয়ায় উপকূলীয় সমুদ্রের পানি রক্তে লাল হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় মানুষ, এমনকি শিশুদেরও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে প্রাণী অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে এই শিকারের নাম ‘গ্রিন্দাদ্রাপ’ বা সংক্ষেপে ‘গ্রিন্দ’। এটি ভাইকিং যুগ থেকে চলে আসা একটি ঐতিহ্য, যার ইতিহাস প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। শিকারের সময় মাছ ধরার নৌকাগুলো একত্র হয়ে পাইলট তিমি ও ডলফিনের দলকে ঘিরে ফেলে এবং ধীরে ধীরে অগভীর পানির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে আসে।
পরে প্রাণীগুলোকে তীরে আটকে ফেলা হয়। এরপর জেলেরা ধারালো ছুরি ব্যবহার করে সেগুলো জবাই করে। স্থানীয় বাসিন্দারা তিমির মাংস ও চর্বি খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেন, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে এই শিকারকে কেন্দ্র করে যে ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হয়, তা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এবারের শিকারের ছবিগুলোতেও দেখা গেছে, উপকূলজুড়ে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে অসংখ্য তিমির মৃতদেহ। প্রাণীগুলোর রক্ত সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশে পুরো উপকূলকে ভয়াবহ লাল রঙে রূপান্তরিত করেছে।
অনেক ছবিতে জেলেদের বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করতে দেখা যায়। পানির ওপর ভেসে থাকা তিমির পাখনাগুলো রক্তাক্ত দৃশ্যকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই প্রথাকে অমানবিক ও নিষ্ঠুর বলে আখ্যা দিয়ে আসছে। তাদের দাবি, আধুনিক যুগে খাদ্যের বিকল্প উৎস থাকা সত্ত্বেও এমন গণহারে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী হত্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অন্যদিকে ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এই শিকারকে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন। ডেনমার্কের স্বশাসিত এই অঞ্চলটির মতে, গ্রিন্দাদ্রাপ শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, বরং এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে খাদ্যের উৎসও।
তাদের যুক্তি হলো, শত শত বছর ধরে এই পদ্ধতি তাদের জীবনধারা ও সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বাইরের সমালোচনা সত্ত্বেও তারা এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে আগ্রহী।
এবারের শিকারে বহু শিশু ও কিশোরকে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের নিহত প্রাণীগুলোর গায়ে হাত দিতেও দেখা যায়। এই বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে প্রাণী অধিকারকর্মীদের মধ্যে।
সমালোচকদের মতে, এমন সহিংস দৃশ্য শিশুদের মানসিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি তাদের সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার একটি উপায়।
ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে তিমি ও ডলফিন শিকারের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কোটা নেই। তবে বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি সামুদ্রিক প্রাণী এই শিকারের শিকার হয়।
গত বছর প্রায় ৮১৪টি লং-ফিনড পাইলট তিমি এবং হোয়াইট-সাইডেড ডলফিন নিহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এই সংখ্যা আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
লং-ফিনড পাইলট তিমি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন্য পরিবেশে স্ত্রী পাইলট তিমি প্রায় ৬০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, আর পুরুষ তিমির গড় আয়ু প্রায় ৪৫ বছর।
তিমি, ডলফিন এবং শুশুকসহ সব ধরনের সিটাসিয়ান প্রাণী সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা খাদ্যশৃঙ্খলকে সুষম রাখতে সহায়তা করে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে অবদান রাখে।
পাইলট তিমির প্রজনন মৌসুম সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হয়ে থাকে। একটি স্ত্রী তিমি সাধারণত তিন থেকে ছয় বছর অন্তর একটি করে বাচ্চার জন্ম দেয়।
এদের সামাজিক কাঠামোও অত্যন্ত জটিল। একটি দলের বয়স্ক ও প্রজননক্ষমতা হারানো স্ত্রী তিমিরা ছোট বাচ্চাগুলোর দেখাশোনা করে। এই সহযোগিতামূলক আচরণ তাদের প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের তিমি শিকার বহু বছর ধরে সংস্কৃতি ও প্রাণী অধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। একদিকে স্থানীয় জনগণ এটিকে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে পরিবেশবাদী ও প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো এটিকে নিষ্ঠুর ও অপ্রয়োজনীয় প্রাণী হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে।
প্রযুক্তি ও আধুনিক খাদ্যব্যবস্থার যুগে এই প্রথার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রতি বছর রক্তে লাল হয়ে ওঠা ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের উপকূল বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করে।

