বাংলাদেশজুড়ে জ্যৈষ্ঠ মাসের তীব্র দাবদাহ জনজীবনকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৩৪টি জেলা বর্তমানে তাপপ্রবাহের আওতায় রয়েছে। দিনের প্রখর রোদ, গরম বাতাস এবং বৃষ্টির স্বল্পতা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও আপাতত তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমার কোনো ইঙ্গিত নেই।
দেশের বিভিন্ন জেলায় তাপপ্রবাহের বিস্তার
গত কয়েকদিন ধরে দেশের অধিকাংশ এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি অবস্থান করছে। রোববার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা নগরবাসীর জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করলে শুধু অস্বস্তিই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। শিশু, বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তীব্র গরমে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বৃষ্টির দেখা মিলছে কম, শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব অব্যাহত
তাপপ্রবাহের পাশাপাশি দেশের অধিকাংশ অঞ্চল প্রায় বৃষ্টিহীন অবস্থায় রয়েছে। ফলে মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে এবং গরমের তীব্রতা আরও বাড়ছে। রোববার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায়। তবে এই বৃষ্টিপাত স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল এবং দেশের সামগ্রিক আবহাওয়ায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
বৃষ্টির অভাবে কৃষি খাতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেক এলাকায় ফসলের জমিতে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও পোলট্রি খামারেও গরমজনিত চাপ বাড়ছে।
আট বিভাগেই বৃষ্টির পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সোমবার দেশের আটটি বিভাগেই কমবেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কয়েকটি এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি কোথাও কোথাও মাঝারি মাত্রার ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের দু-একটি স্থানে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বিদ্যুৎ চমকানো এবং আকস্মিক দমকা হাওয়ার কারণে এসব অঞ্চলের মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে দেশের অনেক এলাকায় আকাশ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। ফলে বৃষ্টির উপস্থিতি থাকলেও তা তাপপ্রবাহ ভাঙার মতো পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।
দিনের ও রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা
সাধারণত বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের দিনের এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। অর্থাৎ বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও গরম থেকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে কংক্রিটের স্থাপনা, যানবাহনের তাপ এবং জনঘনত্বের কারণে তাপমাত্রার অনুভূতি আরও বেশি হচ্ছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও গরম বেশি মনে হচ্ছে নগরবাসীর কাছে।
আবহাওয়াবিদের বক্তব্য: তাপপ্রবাহ কিছুটা কমলেও গরম থাকবে
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের ৩৪টি জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সোমবারও গরম পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তবে আশার কথা হলো, তাপপ্রবাহের বিস্তৃতি ধীরে ধীরে কিছুটা কমতে পারে। অর্থাৎ আক্রান্ত জেলার সংখ্যা কমলেও সামগ্রিকভাবে গরমের অনুভূতি দ্রুত কমে যাবে এমন সম্ভাবনা এখনই নেই।
তার মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টি হচ্ছে এবং আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। বিশেষ করে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
৩ জুনের পর বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত
আবহাওয়াবিদদের ধারণা, ৩ জুনের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে দীর্ঘদিনের গরম পরিস্থিতি কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর অগ্রগতির কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে অন্যান্য এলাকাতেও বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়বে। এর ফলে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে এবং স্বস্তি ফিরতে পারে জনজীবনে।
টেকনাফ উপকূলে মৌসুমি বায়ুর অগ্রগতির সম্ভাবনা
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই টেকনাফ উপকূল এলাকায় মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করতে পারে। এটি বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার পর সাধারণত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
এর ফলে শুধু তাপমাত্রাই কমে না, বরং কৃষি, পরিবেশ এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘ খরার মতো পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে প্রকৃতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনে বর্ষার বৃষ্টি।
রাজধানী ঢাকার সর্বশেষ আবহাওয়া পরিস্থিতি
সোমবার সকাল ৬টায় রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও সকালবেলায় তাপমাত্রা তুলনামূলক কম ছিল, তবে দিনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভ্যাপসা গরম। আর্দ্রতা বেশি থাকায় তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও অস্বস্তি অনেক বেশি অনুভূত হয়। তাই বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দুপুরের প্রখর রোদে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ বর্তমানে মৌসুমি পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। একদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ দেশের ৩৪টি জেলাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, অন্যদিকে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো গরম কমানোর মতো পর্যাপ্ত নয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে এবং মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা রয়েছে। ততদিন পর্যন্ত দেশের মানুষকে গরমের প্রভাব মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে।

