Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবিশেষ প্রতিবেদনতোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন: সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের আরেক নাম

তোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন: সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের আরেক নাম

বাংলাদেশের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহসী নেতৃত্বদানকারী, সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই। সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তাঁর বাবা মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন মেধাবী। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।

এরপর ১৯৬৮-৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন।

লাখো মানুষের উপস্থিতিতে দেওয়া সেই ঘোষণা পরবর্তীতে বাঙালি জাতির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু উপাধি আজ শুধু একজন নেতার পরিচয় নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। এর অল্প সময় পরই শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর চার প্রধান আঞ্চলিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতার একজন ছিলেন। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র ও সাংগঠনিক সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রেরণা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ওপর আস্থা রেখে ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত এই পদে থেকে তিনি নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

স্বাধীনতার পর দেশের পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ একটি অনন্য নাম। তিনি মোট নয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন।

নিজ জেলা ভোলার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি ভোলার উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশের শিল্পখাত সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক জীবনে বহু চড়াই-উতরাই অতিক্রম করেছেন তোফায়েল আহমেদ। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে বহুবার গ্রেপ্তার হন এবং মোট ৩৩ মাসেরও বেশি সময় কারাগারে কাটান।

তবে প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনোই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মকাণ্ডকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিটি সংকট তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন।

তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এমন একজন নেতা, যিনি ছাত্র আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সংসদীয় রাজনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম এক সাহসী সংগ্রামী, দক্ষ সংগঠক এবং অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।