বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরে রওনা দিয়েছেন তারেক রহমান। এই সফরকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। রবিবার (২১ জুন) বিকেল পৌনে ৩টায় রাজধানী ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। এই সফরকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তারেক রহমান-এর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী Anwar Ibrahim-এর আমন্ত্রণে তিনি এই সফরে অংশ নিচ্ছেন। সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও শীর্ষ নেতারা
এ সময় রাজনৈতিক মহলে সফরটি নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায়। কারণ, এই সফরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়া সফরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে:
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য এবং প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ, দক্ষ কর্মী রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য শিল্প, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে।
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীনে যাবেন। এই সফরটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, চীনের প্রধানমন্ত্রী Li Qiang-এর আমন্ত্রণে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত কর্মসূচি ইতোমধ্যেই নির্ধারিত হয়েছে।
আগামী ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী Li Qiang-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। সেখানে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে।
পরদিন ২৬ জুন তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২৩ থেকে ২৫ জুন চীনের Dalian শহরে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলন, যা সামার দাভোস নামেও পরিচিত।
এই সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নেবেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কৌশল নিয়ে সেখানে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজেদের সম্ভাবনা তুলে ধরার বড় সুযোগ।
চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রোটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা, নতুন বিনিয়োগ আনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে তিনটি বড় লাভ হতে পারে:
প্রথমত, নতুন বিনিয়োগের পথ খুলবে।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত হবে।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আগামী ২৬ জুন রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এই সফর শেষে দেশের জনগণ আশা করছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই মালয়েশিয়া ও চীন সফর শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়; বরং এটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট।

