খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeলাইফস্টাইলশুধু কোলেস্টেরল নয়, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বুঝতে কাজে লাগতে পারে ৯ ধরনের রক্তপরীক্ষা

শুধু কোলেস্টেরল নয়, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বুঝতে কাজে লাগতে পারে ৯ ধরনের রক্তপরীক্ষা

সাধারণ এলডিএল কোলেস্টেরল পরীক্ষার পাশাপাশি ApoB পরীক্ষা করলে কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে যাঁদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক আরও বিস্তারিত মূল্যায়ন করতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা বিবেচনা করা হতে পারে।

হৃদ্‌রোগের কথা উঠলেই অনেকে প্রথমে কোলেস্টেরলের কথা ভাবেন। এলডিএল, এইচডিএল বা মোট কোলেস্টেরলের রিপোর্ট হাতে নিয়ে মনে করা হয়, হৃদ্‌যন্ত্র কতটা সুস্থ তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বোঝার বিষয়টি এতটা সরল নয়।

অনেক সময় হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা তৈরি হলেও শুরুতেই বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে এমন কিছু পরিবর্তন হতে পারে, যা ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। রক্তে চর্বির মাত্রা, রক্তে শর্করা, প্রদাহ, বিপাকীয় সমস্যা কিংবা হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ—এসব বিষয়ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

হৃদ্‌যন্ত্রের চিকিৎসক সঞ্জয় ভোজরাজ সম্প্রতি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা পেতে ৯ ধরনের রক্তপরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তিরই সবগুলো পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ডায়াবিটিস, রক্তচাপ, আগের অসুস্থতা এবং সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা বেছে নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

১. অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন বি বা ApoB

অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন বি, সংক্ষেপে ApoB, রক্তে থাকা নির্দিষ্ট ধরনের কোলেস্টেরল-বহনকারী কণিকার সম্পর্কে তথ্য দেয়। এসব কণিকার কিছু ধমনির দেয়ালে চর্বি জমার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণ এলডিএল কোলেস্টেরল পরীক্ষার পাশাপাশি ApoB পরীক্ষা করলে কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে যাঁদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক আরও বিস্তারিত মূল্যায়ন করতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা বিবেচনা করা হতে পারে।

তবে শুধু ApoB-এর একটি রিপোর্ট দেখেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

২. লাইপোপ্রোটিন(a) বা Lp(a)

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির পেছনে শুধু জীবনযাপন নয়, বংশগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। লাইপোপ্রোটিন(a), বা Lp(a), এমন একটি রক্তপরীক্ষা যা বংশগতভাবে থাকা নির্দিষ্ট ধরনের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

শরীরে Lp(a)-এর মাত্রা বেশি থাকলে কিছু মানুষের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগ বা হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক এই পরীক্ষা বিবেচনা করতে পারেন।

এই পরীক্ষার একটি সুবিধা হলো, অনেক ক্ষেত্রে জীবনে একবার পরীক্ষা করেই Lp(a)-এর মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

৩. হাই-সেনসিটিভিটি CRP বা hs-CRP

শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশনের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে hs-CRP পরীক্ষা। শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ থাকলে তা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষার কিছু ভূমিকা রয়েছে। রক্তে hs-CRP-এর মাত্রা বেশি হলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। hs-CRP বেড়ে যাওয়ার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। সংক্রমণ বা শরীরের অন্য কোনো প্রদাহজনিত অবস্থাতেও এর মাত্রা বাড়তে পারে। তাই শুধু এই পরীক্ষার ফল দেখে হৃদ্‌রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

৪. ফাস্টিং ইনসুলিন

খালি পেটে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা জানার জন্য করা হয় ফাস্টিং ইনসুলিন পরীক্ষা। শরীর ইনসুলিনের প্রতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, সে বিষয়ে কিছু তথ্য দিতে পারে এই পরীক্ষা।

ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে বিপাকীয় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবিটিসসহ বিভিন্ন বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

তবে সবার জন্য নিয়মিত ফাস্টিং ইনসুলিন পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী এই পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৫. হিমোগ্লোবিন A1c বা HbA1c

গত কয়েক মাসে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা কেমন ছিল, তা বোঝার জন্য HbA1c পরীক্ষা অত্যন্ত পরিচিত একটি পরীক্ষা। সাধারণত এটি গত প্রায় ২ থেকে ৩ মাসের গড় রক্তশর্করার একটি ধারণা দেয়।

দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালি ও হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ডায়াবিটিস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সেটিও HbA1c রিপোর্ট থেকে বোঝার সুযোগ থাকে।

৬. ওমেগা-৩ ইনডেক্স

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ে গত কয়েক বছরে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ওমেগা-৩ ইনডেক্স পরীক্ষায় লোহিত রক্তকণিকায় থাকা নির্দিষ্ট ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে EPA ও DHA-এর মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে ওমেগা-৩-এর অবস্থা সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে। খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক পুষ্টিগত অবস্থার মূল্যায়নে এটি কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

তবে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে এই একটি পরীক্ষাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা উচিত নয়।

৭. ট্রাইগ্লিসারাইড-টু-HDL অনুপাত

রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড এবং HDL কোলেস্টেরলের মাত্রার মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে এই অনুপাত ব্যবহার করা হয়। শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের কিছু ধারণা পেতে এটি কাজে লাগতে পারে।

ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি এবং HDL তুলনামূলকভাবে কম হলে অনেক ক্ষেত্রে বিপাকীয় সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। তবে এই অনুপাত দিয়ে একাই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

রক্তচাপ, এলডিএল, মোট কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, বয়স এবং অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে মিলিয়ে রিপোর্ট মূল্যায়ন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৮. ভিটামিন ডি পরীক্ষা

শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কম থাকা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

তবে ভিটামিন ডি কম থাকলেই একজনের হৃদ্‌রোগ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একইভাবে শুধু ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেই হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, এমন নিশ্চিত প্রমাণও নেই।

তাই ভিটামিন ডি কম পাওয়া গেলে নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

৯. NT-proBNP

হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে কি না, তা মূল্যায়নে NT-proBNP গুরুত্বপূর্ণ একটি রক্তপরীক্ষা। বিশেষ করে হার্ট ফেলিয়োরের মতো অবস্থার মূল্যায়নে চিকিৎসকেরা এই পরীক্ষার ফল ব্যবহার করেন।

হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে গেলে বা হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়লে রক্তে NT-proBNP-এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উপসর্গের পাশাপাশি এই পরীক্ষার ফল চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে।

তবে NT-proBNP-এর মাত্রা বয়স ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার কারণেও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই রিপোর্ট চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

সব ৯টি পরীক্ষা কি সবার দরকার?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বুঝতে এই ৯টি পরীক্ষার কথা বলা হলেও প্রত্যেক মানুষের জন্য সবগুলো পরীক্ষা প্রয়োজনীয় নয়

কারও বয়স কম এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি খুব কম হলে অনেক পরীক্ষাই প্রয়োজন নাও হতে পারে। আবার পরিবারের সদস্যদের অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে বা ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কিংবা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে চিকিৎসক অতিরিক্ত কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।

অর্থাৎ শুধু একটি রিপোর্ট দেখে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। রক্তচাপ, ওজন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান, ডায়াবিটিস, কোলেস্টেরল এবং পারিবারিক ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়ে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা দরকার।

শুধু রক্তপরীক্ষাই হৃদ্‌রোগ শনাক্ত করার উপায় নয়

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, রক্তপরীক্ষা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়ক হলেও এগুলো হৃদ্‌যন্ত্রের সব ধরনের রোগ শনাক্ত করতে পারে না।

বুকে চাপ বা ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়া, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক হৃদ্‌স্পন্দন বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে শুধু রক্তপরীক্ষার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো নিজের ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্বাচন করা। কারণ হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শুধু একটি পরীক্ষার রিপোর্ট নয়, বরং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা কোন পরীক্ষা আপনার প্রয়োজন, তা নির্ধারণের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ