খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিটিকটকের বিরুদ্ধে শিশুদের তথ্য চুরির অভিযোগ, ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতা

টিকটকের বিরুদ্ধে শিশুদের তথ্য চুরির অভিযোগ, ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতা

মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, টিকটক দীর্ঘ সময় ধরে ১৩ বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশুর কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এই বয়সী কোনো শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের আগে তার বাবা-মা বা অভিভাবকের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়েছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক। ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের গোপনীয়তা রক্ষার আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতায় পৌঁছেছে টিকটক ও এর মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স।

মামলাটি নিষ্পত্তি করতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে মোট ৪০ কোটি ডলার দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এটি অন্যতম বড় আর্থিক সমঝোতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, টিকটক দীর্ঘ সময় ধরে ১৩ বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশুর কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এই বয়সী কোনো শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের আগে তার বাবা-মা বা অভিভাবকের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় মার্কিন বিচার বিভাগ টিকটক এবং বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে এই মামলা করে। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল শিশুদের বয়স যাচাই এবং অভিভাবকের সম্মতি নেওয়ার ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো চিলড্রেনস অনলাইন প্রাইভেসি প্রটেকশন অ্যাক্ট (COPPA)। ২০০০ সালে কার্যকর হওয়া এই আইনের আওতায় ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম মানতে হয়।

মার্কিন সরকারের সঙ্গে করা সমঝোতা অনুযায়ী, টিকটক ও বাইটড্যান্সকে মোট ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ডলার দিতে হবে।

এর মধ্যে প্রথম ধাপে প্রতিষ্ঠান দুটি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে ৩০ কোটি ডলার পরিশোধ করবে। এরপর ২০১৯ সালে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সঙ্গে করা একটি পুরোনো আইনি সমঝোতা বাতিলের পর আরও ১০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে।

এই অর্থ প্রদানের মাধ্যমে শিশুদের গোপনীয়তা সংক্রান্ত মামলাটি নিষ্পত্তির পথে এগোবে।

মার্কিন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট শুমেট বলেছেন, মামলা শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানে শিশু ও অভিভাবকেরা আরও ভালো সুরক্ষা পাচ্ছেন। অর্থাৎ, সরকারের দৃষ্টিতে টিকটকের নীতি ও ব্যবস্থাপনায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে।

শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইন ভঙ্গের অভিযোগে এর আগেও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়েছে।

২০১৯ সালে ইউটিউবকে শিশুদের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৭ কোটি ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল। এর কয়েক বছর পর ২০২২ সালে গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এপিক গেমসকে প্রায় ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।

তবে টিকটকের সঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের এই সমঝোতা আগের অনেক মামলার তুলনায় বড় অঙ্কের।

শুধু টিকটক নয়, শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মেটার বিরুদ্ধেও বড় আইনি লড়াই চলছে।

দেশটির ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিশু ও কিশোরদের লক্ষ্য করে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই মামলার বিচারও শুরু হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মেটাকেও বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় আইনি ও ব্যবসায়িক বিষয় হয়ে উঠেছে।

টিকটকের বিরুদ্ধে বর্তমান মামলার সঙ্গে ২০১৯ সালের একটি পুরোনো আইনি সমঝোতারও সম্পর্ক রয়েছে।

সে সময় বাইটড্যান্সের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান মিউজিক্যালি-র বিরুদ্ধে শিশুদের গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৫৭ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল।

পাশাপাশি ১৩ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু অ্যাপ ব্যবহার করতে চাইলে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সম্মতি নেওয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমান মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে এসব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

মার্কিন সরকারের আইনজীবীদের অভিযোগ ছিল, টিকটক প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের বয়স কার্যকরভাবে যাচাই করা হতো না। ফলে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরাও সহজেই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করার সুযোগ পেত।

শুধু তাই নয়, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অভিভাবকের সম্মতিও যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।

মামলা দায়েরের সময় মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ কোটিরও বেশি কিশোর ব্যবহারকারী ছিল। একই সঙ্গে শিশুদের মধ্যেও অ্যাপটির জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক।

সরকারের অভিযোগ ছিল, এই বিশাল তরুণ ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর তথ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর ছিল না।

মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মামলা দায়ের হওয়ার পর টিকটকের কার্যক্রমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন, ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষার নীতিতে সংশোধন এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

অর্থাৎ, শুধু আর্থিক সমঝোতাই নয়, শিশু ও কিশোর ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা বাড়াতেও প্ল্যাটফর্মটিকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

শুক্রবারের ঘোষণায় মার্কিন বিচার বিভাগ টিকটকের বিরুদ্ধে জরিমানার বাইরে নতুন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়নি।

টিকটককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ও রাজনৈতিক চাপ শুধু শিশুদের গোপনীয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাইটড্যান্সের মালিকানায় থাকা টিকটকের মার্কিন কার্যক্রম নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।

২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন টিকটক নিষিদ্ধ করা অথবা যুক্তরাষ্ট্রে এর ব্যবসাকে বাইটড্যান্স থেকে আলাদা করার বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও টিকটকের মার্কিন কার্যক্রম আলাদা করার পক্ষে অবস্থান নেন।

গত বছর সেই মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়।

বর্তমানে টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার ৮১ শতাংশ মালিকানা একটি বিনিয়োগকারী জোটের হাতে রয়েছে। বাইটড্যান্সের হাতে রয়েছে বাকি ১৯ শতাংশ।

বাইটড্যান্স বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ বিনিয়োগ মূল্যায়ন অনুযায়ী, কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন ডলার।

তাই টিকটকের ওপর ৪০ কোটি ডলারের এই আর্থিক সমঝোতা কোম্পানিটির মোট মূল্যমানের তুলনায় খুব বড় আঘাত না হলেও, শিশুদের তথ্য সুরক্ষা নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

বর্তমানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে—এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও বাড়ছে।

টিকটকের এই সমঝোতা শুধু একটি কোম্পানির আইনি সমস্যার সমাধান নয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি সহজে মেনে নেওয়া হবে না।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়স যাচাই, অভিভাবকের সম্মতি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

টিকটকের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির নীতি ও মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও, এই ৪০ কোটি ডলারের সমঝোতা দেখিয়ে দিল যে শিশুদের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি এখন প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় আইনি চ্যালেঞ্জ।

এদিকে এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে টিকটকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো প্রতিনিধি সাড়া দেননি।


Discover more from News Bangla24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Table of contents [hide]

আর্কাইভ