ভেজাল ও নকল ওষুধের কারবার নিয়ে মাঝেমধ্যেই সামনে আসে নানা অভিযোগ। বাজারে নামী সংস্থার আসল ওষুধের পাশাপাশি নকল বা নিম্নমানের ওষুধ ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকায় ক্রেতাদের সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে সুগার, প্রেশার কিংবা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত খেতে হয় এমন ওষুধের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
শুধু দোকান থেকেই নয়, অনলাইনেও ওষুধ কেনার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ওষুধের প্যাকেট, ব্যাচ নম্বর, মেয়াদ, প্রস্তুতকারক সংস্থার তথ্যসহ বেশ কিছু বিষয় যাচাই করে তবেই ওষুধ কেনা উচিত।
ওষুধ কেনার আগে প্রথমেই নজর দিন প্যাকেট ও স্ট্রিপের দিকে। আসল ওষুধের প্যাকেটে সাধারণত লেখা স্পষ্ট থাকে এবং বানান বা ছাপার ভুল থাকার কথা নয়। লেখাগুলি ঝাপসা, অসমান কিংবা বানানে অস্বাভাবিকতা থাকলে সতর্ক হওয়া দরকার।
প্রস্তুতকারক সংস্থার নাম, লোগো এবং প্যাকেটের রংও ভালো করে মিলিয়ে দেখুন। নিয়মিত যে ওষুধ খান, সেটির পুরনো প্যাকেট থাকলে নতুন প্যাকেটের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে পারেন। লোগোর আকার বা রঙে অস্বাভাবিক পার্থক্য থাকলে ওষুধটি কেনার আগে অবশ্যই যাচাই করুন।
প্যাকেট ছেঁড়া কি না, স্ট্রিপের ফয়েল আলগা হয়েছে কি না, কিংবা শিশিতে থাকা তরল ওষুধের সিল ঠিক আছে কি না এসবও দেখে নেওয়া জরুরি।
ওষুধের প্যাকেটে ব্যাচ নম্বর, উৎপাদনের তারিখ এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ স্পষ্টভাবে লেখা আছে কি না দেখে নিন। এই তথ্যগুলির কোনওটি অস্পষ্ট, মুছে যাওয়া বা সন্দেহজনক মনে হলে ওষুধটি না কেনাই ভালো।
বিশেষ করে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ কখনও ব্যবহার করা উচিত নয়। নিয়মিত খাওয়ার ওষুধ হলেও প্রতিবার কেনার সময় মেয়াদের তারিখ একবার দেখে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
অনেক ওষুধের প্যাকেটে বারকোড বা কিউআর কোড থাকে। প্যাকেটে এমন কোড থাকলে স্মার্টফোনের সাহায্যে সেটি স্ক্যান করে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
তবে শুধু কিউআর কোড আছে বলেই ওষুধটি আসল ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোড থেকে পাওয়া তথ্য প্রস্তুতকারক সংস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্যের সঙ্গে মিলছে কি না সেটিও দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
ওষুধের ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের রং, আকৃতি এবং গঠনেও অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে সতর্ক হোন। নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধ হলে আগের স্ট্রিপের সঙ্গে নতুন ওষুধটি মিলিয়ে দেখতে পারেন।
ট্যাবলেট ভেঙে যাওয়া, অতিরিক্ত গুঁড়ো হয়ে থাকা, অস্বাভাবিক নরম হয়ে যাওয়া কিংবা ক্যাপসুলের রঙে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেলে সেটি ব্যবহার করার আগে ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তবে শুধু রং বা আকৃতি সামান্য আলাদা হলেই ওষুধ নকল এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। উৎপাদনকারী সংস্থার পরিবর্তন বা ফর্মুলেশনের কারণে চেহারায় পার্থক্যও হতে পারে।
সিরাপ বা অন্য তরল ওষুধ কেনার সময় বোতলের সিল অক্ষত আছে কি না পরীক্ষা করুন। বোতলের তরলে অস্বাভাবিক কিছু ভাসছে কি না, রং বা গন্ধে বড় ধরনের পরিবর্তন আছে কি না, সেটিও খেয়াল করা দরকার।
বোতলের তলায় অস্বাভাবিকভাবে গুঁড়ো বা পলি জমে থাকতে দেখলে নিজের মতো করে ওষুধটি খাবেন না। ওষুধটি প্রস্তুতকারক সংস্থা বা চিকিৎসক-ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ।
ওষুধের প্যাকেটে প্রস্তুতকারক সংস্থার নাম ও ঠিকানা স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে কি না দেখুন। সংস্থার তথ্য অস্পষ্ট বা সন্দেহজনক হলে ওষুধটি কেনার আগে যাচাই করা উচিত।
প্যাকেটে থাকা অনুমোদন, রেজিস্ট্রেশন বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যও দেখে নেওয়া যেতে পারে। কোনও তথ্য নিয়ে সন্দেহ হলে সরাসরি প্রস্তুতকারক সংস্থার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সংশ্লিষ্ট ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করুন।
কোনও ওষুধ সাধারণত যে দামে বিক্রি হয়, তার তুলনায় হঠাৎ অনেক কম দামে পাওয়া গেলে সতর্ক হন। আবার অস্বাভাবিক বেশি দামেও ওষুধ বিক্রি করা হলে কারণটি জানতে চান।
শুধু কম দাম মানেই ওষুধ নকল এমন নয়। তবে অস্বাভাবিক দামের ক্ষেত্রে ওষুধের উৎস, প্যাকেজিং এবং প্রস্তুতকারকের তথ্য আরও ভালোভাবে যাচাই করা দরকার।
ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে দোকান নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত ও অনুমোদিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার চেষ্টা করুন। অনলাইনে কিনলে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন।
অচেনা সোশ্যাল মিডিয়া পেজ, ব্যক্তিগত বিক্রেতা বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইট থেকে ওষুধ কেনা এড়িয়ে চলাই ভালো। বিশেষ করে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং বৈধ প্রেসক্রিপশন মেনে চলুন।
ওষুধ কেনার পর রসিদ বা বিল নিয়ে নিন। রসিদে ওষুধের নাম, ব্যাচ নম্বর, দাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য থাকলে ভবিষ্যতে কোনও সমস্যা হলে সেটি কাজে লাগবে।
ওষুধ খাওয়ার পর অস্বাভাবিক কোনও উপসর্গ দেখা দিলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ চালিয়ে না গিয়ে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সন্দেহজনক ওষুধের প্যাকেট ও বিলও সংরক্ষণ করে রাখুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনও ওষুধের প্যাকেট, সিল, মেয়াদ, রং বা গুণমান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সেটি নিজের মতো করে খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে সুগার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ওষুধের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখবেন, ওষুধ দেখতে আসলের মতো হলেই সেটি আসল এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই ওষুধ কেনার সময় কয়েক মিনিট সতর্কভাবে প্যাকেট ও তথ্য যাচাই করা অনেক বেশি নিরাপদ। সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক, নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট বা সংশ্লিষ্ট ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিন।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

