বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এর প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। শিল্পকারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, কৃষি, সেবা খাত—সব জায়গাতেই বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং, কোথাও বিদ্যুৎ থাকলেও ভোল্টেজের সমস্যা, আবার কোথাও বাড়তি খরচ করে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ নিতে হচ্ছে।
সাভারের পল্লী বিদ্যুতের এক গ্রাহক রোজিনার অভিজ্ঞতাই পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ যেমন বারবার চলে যাচ্ছে, তেমনি প্রিপেইড মিটারে টাকাও দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার এখন শুধু স্বস্তির বিষয় নয়, বরং বাড়তি ব্যয়ের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের অভিযোগ, এ বছর লোডশেডিংয়ের মাত্রা আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় পরিস্থিতি বেশি কঠিন। কিছু এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বাংলাদেশে কেন সংকট কাটছে না? আর এই সংকট থেকে বের হওয়ার বাস্তবসম্মত পথই বা কী?
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, তবু সংকট কেন?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে এত বড় পার্থক্য কেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার মেগাওয়াট। গ্রিড পর্যায়ে ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎসহ সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।
চলতি বছরের মে মাসে দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিংও বড় আকার ধারণ করেছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট এক দিনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছিল।
অর্থাৎ কাগজে-কলমে সক্ষমতা থাকলেই যে মানুষের ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছাবে, বাস্তবতা তা বলছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা, তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও সেগুলো চালানো সম্ভব হয় না।
মূল সংকট আসলে জ্বালানিতে
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে প্রাথমিক জ্বালানির সংকট। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হলেও সেই অনুপাতে গ্যাস উৎপাদন বাড়েনি। কয়লা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশ প্রত্যাশিত অগ্রগতি করতে পারেনি। ফলে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে।
বিশেষ করে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা বিদ্যুৎ খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ে। আবার ডলার সংকট থাকলে জ্বালানি আমদানি করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি অবকাঠামোর নানা সীমাবদ্ধতা ও যান্ত্রিক সমস্যা। ফলে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
অতিরিক্ত সক্ষমতাও কি সমস্যার অংশ?
গত এক যুগে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে তেলভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বেসরকারি খাতকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে একসময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু সক্ষমতা থাকলেও সব কেন্দ্র নিয়মিত চালানো হয়নি। অনেক কেন্দ্র বসে থেকেছে, অথচ সেগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ বা সক্ষমতার মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে।
ফলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির খরচ, ভর্তুকি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন আর্থিক দায় মিলে খাতটি আরও চাপের মধ্যে পড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘাটতি পূরণের জন্য নেওয়া জরুরি উদ্যোগের ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সক্ষমতার বিপরীতে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হয়েছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র কম’—এমন সরল সমীকরণে বোঝা যাবে না। কোথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, কোন জ্বালানিতে হচ্ছে, কত খরচে হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে—পুরো ব্যবস্থাটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংকটের বড় প্রভাব
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে উৎপাদনমুখী শিল্পে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে সময়মতো অর্ডার শেষ করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
গাজীপুরের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথাও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
একটি কারখানার জন্য বিদ্যুৎ চলে যাওয়া মানে শুধু কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ থাকা নয়। মেশিন চালু হতে সময় লাগে, উৎপাদন পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়, শ্রমিকদের কাজের সময় নষ্ট হয় এবং অর্ডার সরবরাহে বিলম্ব হয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় বিদেশি ক্রেতাদের ক্ষেত্রে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতা অন্য দেশ বা অন্য কারখানা থেকে অর্ডার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারেও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সাধারণ মানুষের ওপর দ্বিমুখী চাপ
বিদ্যুৎ সংকটে সাধারণ মানুষ দুই ধরনের সমস্যায় পড়ছে। প্রথমত, নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিকল্পভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক পরিবারকে চার্জার ফ্যান, ব্যাটারি, আইপিএস কিংবা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে খরচ আরও বেশি। ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে গিয়ে তাদের জ্বালানি খরচ বাড়ছে।
অন্যদিকে প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের একটি অংশের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার অনুযায়ী ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হলেও গ্রাহকের ব্যয়ের চাপ কমছে না।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে দীর্ঘ লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তাও নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাহলে সমাধান কী?
বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করতে হলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না। বরং উৎপাদন, জ্বালানি, সঞ্চালন, বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে সংস্কার দরকার।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা। যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে চালানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গ্যাসের অপচয় কমাতে হবে। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি।
সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। বাড়ির ছাদ, শিল্পকারখানার ছাদ, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অনাবাদি জমিতে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
সেচের ক্ষেত্রেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ডিজেলনির্ভর সেচ কমবে এবং কৃষকদের জ্বালানি ব্যয়ও কমতে পারে।
তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে শুধু প্রকল্প ঘোষণা করলেই হবে না। গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার সক্ষমতা, ব্যাটারি স্টোরেজ, জমি, বিনিয়োগ নীতি এবং বিদ্যুৎ কেনার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি চাহিদা ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
পুরোনো ও বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে এমন যন্ত্রের পরিবর্তে শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুতের অপচয় কমানো সম্ভব।
বাড়িতেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অপ্রয়োজনীয় আলো, এসি বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার বন্ধ রাখা গেলে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদার ওপর চাপ কমবে।
গ্যাসনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে
বিশ্লেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত গ্যাসনির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানো।
শিল্পে যেখানে সম্ভব গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বয়লার ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক যানবাহন বাড়ানো যেতে পারে। কৃষিতে ডিজেলচালিত সেচের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
তবে এর জন্য প্রথম শর্ত হলো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ। মানুষকে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবস্থায় যেতে বলার আগে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য হতে পারে বড় সমাধান
বাংলাদেশ একা সব ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে—এমন চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত থেকে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। নেপাল থেকেও জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে ভুটানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক গ্রিড তৈরি হলে কোনো দেশে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকলে অন্য দেশ তা আমদানি করতে পারবে। এতে জরুরি সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলা করা সহজ হতে পারে।
তবে আমদানির ক্ষেত্রেও খরচ গুরুত্বপূর্ণ। যে বিদ্যুৎ যে দামে আমদানি করা হচ্ছে, তা বাংলাদেশের গ্রাহক ও অর্থনীতির জন্য কতটা যৌক্তিক—সেটি স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার।
বিশেষ করে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী দরকষাকষি করা জরুরি। বিদ্যুৎ আমদানির লক্ষ্য হওয়া উচিত ঘাটতি পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা প্রকল্পকে সুবিধা দেওয়া নয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ ইতোমধ্যে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের বেসলোড বিদ্যুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।
তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকে রাতারাতি বর্তমান সংকটের সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতকে সেবা হিসেবে দেখতে হবে
বিদ্যুৎ খাত নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো এর অর্থনৈতিক কাঠামো। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বিদ্যুৎকে শুধু ব্যবসা বা মুনাফার উৎস হিসেবে দেখলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। এজন্য উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৃত খরচ, চুক্তি এবং মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি স্বচ্ছ করতে হবে।
কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন নেওয়া হলো, তার উৎপাদন খরচ কত, কতদিন চালানো হবে এবং কেন্দ্রটি বসে থাকলেও কী পরিমাণ অর্থ দিতে হবে—এসব তথ্য জনসম্মুখে থাকা দরকার।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব। সরকার পরিবর্তন হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিতে বড় পরিবর্তন এলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও অবকাঠামো পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়।
তাই অন্তত ১০ থেকে ২০ বছরের একটি জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন। সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে—কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, কোন উৎস থেকে কত বিদ্যুৎ আসবে, কতটা নবায়নযোগ্য হবে, কতটা আমদানি করা হবে এবং কোন জ্বালানিতে কতটা নির্ভরতা রাখা হবে।
এই পরিকল্পনা রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে যেন বারবার বদলে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সামনে বাংলাদেশের করণীয় কী?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান একটি মাত্র পদক্ষেপে সম্ভব নয়। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেশি জ্বালানি আমদানি কিংবা শুধু লোডশেডিং কমানোর উদ্যোগ দিয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।
স্বল্পমেয়াদে কম খরচে উৎপাদন করতে সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পর্যাপ্ত জ্বালানি দিয়ে চালু রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়িয়ে জরুরি ঘাটতি সামাল দিতে হবে।
মধ্যমেয়াদে গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির বাস্তবসম্মত ব্যবহার, সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে।
আর দীর্ঘমেয়াদে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড শক্তিশালী করতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অস্বচ্ছ ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু ‘উৎপাদন কম’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাংলাদেশের আসল সমস্যা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যয়বহুল উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা, অতিরিক্ত সক্ষমতা, দুর্বল সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার সম্মিলিত ফল।
তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
মানুষের ঘরে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পকারখানাকে প্রতিযোগিতামূলক রাখা, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। একটি কার্যকর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু আলো জ্বালায় না; এটি একটি দেশের অর্থনীতি সচল রাখে।
বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই সাশ্রয়ী জ্বালানি, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার দিকে এগোয়, তাহলে বর্তমান সংকট ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু শুধু সংকট দেখা দিলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরে আবার পুরোনো কাঠামোয় ফিরে গেলে একই সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে ফিরে আসবে।
সুতরাং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের আসল সমাধান নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং কম খরচে, নির্ভরযোগ্যভাবে এবং বৈচিত্র্যময় জ্বালানি উৎসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের একটি টেকসই ব্যবস্থা তৈরি করা। সেটিই হতে পারে দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

