নিউ মার্কেটের শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হোটেলের মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই তিনি গা-ঢাকা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। ঘটনার তিন দিন পর শনিবার ডায়মন্ড হারবার রোডের বেহালায় নিজের বাড়ি থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভয়াবহ এই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন আবাসিক। তাঁদের মধ্যে ৮ জনই বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর থেকেই হোটেল মালিকের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল। আগুন লাগার পর হোটেলের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও মালিকের ফোনে সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়ে। অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই লুকোচুরির অবসান হলো।
মঙ্গলবার গভীর রাতে মধ্য কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে হোটেলের বিভিন্ন অংশে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়।
আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে হোটেলের ভেতরে থাকা আবাসিকদের অনেকেই বের হওয়ার সুযোগ পাননি। দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ততক্ষণে ঘটে যায় মর্মান্তিক বিপর্যয়।
এই ঘটনায় মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশের নাগরিক। বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁরা কলকাতায় এসেছিলেন। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ আবার অন্য কাজে শহরে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভয়াবহ আগুন তাঁদের আর বাড়ি ফিরতে দিল না।
অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠতে শুরু করে শিখা ইনের মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে ঘিরে। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন পাশের হোটেলের কর্মীরা। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
মির্জা গালিব স্ট্রিটে বীরেশ্বর মিত্রের দুটি হোটেল ছিল। একটি শিখা ইন এবং অন্যটি জাপন। দুটি হোটেলই পাশাপাশি অবস্থিত। শিখা ইনের ঠিক উল্টো দিকেই রয়েছে জাপন হোটেল।
মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জাপন হোটেলের কর্মীরা প্রথম দেখতে পান, রাস্তার উল্টো দিকের শিখা ইন থেকে ভয়াবহ আগুনের লেলিহান শিখা বের হচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তাঁরা দ্রুত হোটেল মালিককে খবর দেওয়ার চেষ্টা করেন।
জাপন হোটেলের কর্মী ইন্দ্রদেব পাসওয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রথমেই বীরেশ্বর মিত্রকে ফোন করেন। কিন্তু ফোন ধরেননি মালিক। এরপর আরও কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাতেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরে একটি সময় তাঁর মোবাইল ফোন সুইচড অফ হয়ে যায়।
এরপর থেকেই বীরেশ্বর মিত্রের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্তকারীরা হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং হোটেল পরিচালনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। একই সঙ্গে হোটেলের মালিক ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসে।
বীরেশ্বর মিত্রের অনুপস্থিতি তদন্তকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর একজন হোটেল মালিকের দ্রুত ঘটনাস্থলে থাকার কথা থাকলেও তিনি কেন সেখানে ছিলেন না, কেন ফোন ধরলেন না এবং কেন পরে মোবাইল বন্ধ হয়ে গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল পুলিশ।
অবশেষে শনিবার বেহালার ডায়মন্ড হারবার রোডের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের এই পদক্ষেপের ফলে শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় পাঁচ মাস আগে শিখা ইনের একটি তলা বীরেশ্বর মিত্র এক ব্যবসায়ীর কাছে লিজ দিয়েছিলেন। ওই ব্যবসায়ীর নাম আবু জাফর।
তথ্য অনুযায়ী, হোটেলের ওই তলা ব্যবহারের বিনিময়ে আবু জাফর প্রতি মাসে বীরেশ্বর মিত্রকে ৪০ হাজার টাকা করে দিতেন। অর্থাৎ হোটেলের পরিচালনা ও ব্যবহারের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির ভূমিকা ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্তকারীরা তাই শুধু মালিকের ভূমিকাই নয়, লিজ নেওয়া ব্যবসায়ীসহ হোটেলের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের কার্যকলাপও খতিয়ে দেখছেন।
ভয়াবহ আগুনে প্রাণহানির পর আবু জাফরও পুলিশের নজরে চলে আসেন। অভিযোগ, ঘটনার পর তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকার মদনমোহন বর্মন স্ট্রিটের বাড়ি থেকে পরিবার নিয়ে সরে যান।
তাঁর উত্তরপ্রদেশে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন। তবে কলকাতা ছাড়ার আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি।
লালবাজারের গোয়েন্দারা পূর্ব কলকাতার এন্টালিতে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করেন। ফলে শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে মালিক বীরেশ্বর মিত্রের পাশাপাশি লিজ নেওয়া ব্যবসায়ী আবু জাফরের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো প্রাণহানি। ৯ জন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, একাধিক পরিবারের জীবনে গভীর শোক নামিয়ে এনেছে। তাঁদের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ায় ঘটনাটি দুই দেশের মানুষের মধ্যেই ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।
বিদেশে গিয়ে হোটেলে থাকার সময় একজন পর্যটক বা রোগীর সবচেয়ে বড় ভরসা থাকে নিরাপদ পরিবেশ। বিশেষ করে রাতে হোটেলে আগুন লাগলে দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জরুরি পথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিখা ইন ঘটনায় সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর ছিল, সেটিই এখন তদন্তের বড় বিষয়।
এই ঘটনার পর কলকাতার ছোট হোটেল ও আবাসিক ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট হোটেলে অগ্নিকাণ্ড হলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি সরু রাস্তা, পর্যাপ্ত জরুরি বের হওয়ার পথ না থাকা কিংবা অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ঘাটতি থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
বীরেশ্বর মিত্র গ্রেপ্তার হওয়ার পর তদন্তকারীদের সামনে এখন একাধিক প্রশ্ন। হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কী ছিল? নিয়মিতভাবে সেগুলো পরীক্ষা করা হতো কি না? আগুন লাগার সময় হোটেলে ঠিক কতজন আবাসিক ছিলেন? জরুরি অবস্থায় তাঁদের বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
একই সঙ্গে আবু জাফরের সঙ্গে হোটেল পরিচালনার সম্পর্ক এবং তিনি লিজ নেওয়া তলায় কী ধরনের কার্যক্রম চালাতেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডের পর তিন দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর হোটেল মালিকের গ্রেপ্তার তদন্তে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে তাঁর গ্রেপ্তারই শেষ কথা নয়। আগুনের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং ৯ জনের মৃত্যুর জন্য কার বা কাদের দায় রয়েছে—তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যেন শুধুমাত্র একটি মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে থেমে না যায়। হোটেল ও আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা গেলে ভবিষ্যতে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। আর সেই কারণেই শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডের তদন্তের ফলাফলের দিকে এখন নজর কলকাতা এবং বাংলাদেশ—দুই জায়গাতেই।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

