বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের রাজনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সফর আয়োজনের বিষয়ে ভারতের আগ্রহ থাকলেও ঢাকার পক্ষ থেকে দেওয়া কয়েকটি শর্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন মোড় দিয়েছে।
সফরের আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি থাকা ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ এবং শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার অভিযুক্তদের হস্তান্তরের মতো বিষয় সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, ঢাকার এই কঠোর অবস্থান কি শুধুই কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল? নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে পুরোনো কাঠামো থেকে বের করে নতুনভাবে সাজানোর একটি বড় পরিকল্পনার অংশ?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এর পেছনে শুধু একটি সফরের হিসাব নেই। বরং শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কেন আটকে গেল সম্ভাব্য ভারত সফর?
ভারত প্রথমে বাংলাদেশকে আগামী সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে ঢাকা সেই আমন্ত্রণে আগ্রহ দেখায়নি। বাংলাদেশের আগ্রহ ছিল ভারতের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে সরাসরি আলোচনা করা।
এরপর ভারত দ্রুত দ্বিপক্ষীয় সফরের উদ্যোগ নেয়। চলতি আগস্টেই সফরটি আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা বাড়ে। এমনকি সম্ভাব্য সফরের সময় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু এর মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি প্রেস ব্রিফিংকে কেন্দ্র করে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ঢাকার ক্ষোভ প্রকাশের ধরনকে অনেকে নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করেন।
এর কয়েক দিন পর ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। সাক্ষাতের পর তিনি দিল্লি সফর করেন। পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান বৈঠকে বাংলাদেশের মনোভাব তুলে ধরেন বলে জানা যায়।
দিল্লি থেকে ফিরে আসার পর আবারও দ্বিপক্ষীয় সফরের আলোচনা গতি পায়। মনে হচ্ছিল, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্কের টানাপোড়েন কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু ঠিক সেই সময় ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে আসে নতুন বার্তা।
সফরের আগে ঢাকার কী কী শর্ত?
ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারত সফরের আগে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। এই অবস্থানের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সামনে আসে।
প্রথমত, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি থাকা অন্যান্য পলাতক আসামিকে দ্রুত হস্তান্তরের বিষয়টি।
দ্বিতীয়ত, শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে হস্তান্তর করা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব বিষয় ভারতকে জানানো হয়েছে এবং এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণত কোনো শীর্ষ পর্যায়ের সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সেগুলো আলোচনার টেবিলে তোলার পথ খোলা থাকে। কিন্তু সফরের পরিবেশ তৈরির পূর্বশর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু দাবি সামনে রাখলে সেটি আলোচনার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করে।
ভারতের কাছে কেন বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে?
ঢাকার এই অবস্থান ভারতের কাছে অনেকটা অপ্রত্যাশিত ছিল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্তের মতে, বাংলাদেশের উত্থাপিত বিষয়গুলো দিল্লির অজানা নয়। কিন্তু সেগুলোকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে শর্ত হিসেবে সামনে আনার বিষয়টিই নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।
তাঁর যুক্তি হলো, দুই দেশের মধ্যে সমস্যা যতই থাকুক, আলোচনার মাধ্যমেই সেগুলোর সমাধান খুঁজতে হয়। কারণ আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে গেলে সম্পর্কের জট আরও বাড়তে পারে।
এখানেই মূল প্রশ্ন। বাংলাদেশ যে বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেগুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই আলোচনা কি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের আগে শর্তের মাধ্যমে হবে, নাকি বৈঠকের টেবিলেই হবে—এই কৌশলগত সিদ্ধান্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কি বাস্তবে সম্ভব?
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি হলো শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানো। কিন্তু দিল্লির অবস্থান এখনো আগের মতোই রয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের পর্যালোচনায় রয়েছে।
অর্থাৎ দ্রুত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এখানেই ঢাকার দাবির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভারত অতীতে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আশ্রয় দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান করেছেন। ফলে শুধু কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলেই ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে—এমনটা ধরে নেওয়া কঠিন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই বাস্তবতা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও জানা। তারপরও কেন এটিকে দ্বিপক্ষীয় সফরের পূর্বশর্ত করা হলো, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
শুধু শেখ হাসিনা নয়, আছে আরও বড় রাজনৈতিক হিসাব
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনকে শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশের বাইরে চলে যান। শেখ হাসিনাও ভারতে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এই অবস্থায় ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকার আশঙ্কা হলো, ভারত থেকে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত অবশ্য শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্য বা রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে নিজেদের সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তারপরও অবিশ্বাসের জায়গাটি পুরোপুরি দূর হয়নি।
‘হাসিনা কার্ড’ নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে যে সংশয় রয়েছে, সেটি বেশ স্পষ্ট।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সম্প্রতি ভারতকে ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কোনো চেষ্টা মেনে নেবে না।
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ঢাকার কাছে বিষয়টি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এটি দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত।
ঢাকার প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত কি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেবে, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ কি সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চাইছে?
কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—ঢাকা কি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে?
সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরের বিশ্লেষণে, শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় এখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশ পুরোনো সম্পর্কের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে।
এখানে ‘রিসেট’ শব্দটির গুরুত্ব অনেক।
রিসেট মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং পুরোনো হিসাব-নিকাশ নতুন করে সাজানো। কোন বিষয়ে সহযোগিতা হবে, কোন বিষয়ে পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকবে এবং কোন বিষয়ে একে অন্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করা হবে—এসব বিষয়ে নতুন বোঝাপড়া তৈরি করা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির যে কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত করা হচ্ছে।
অর্থাৎ ঢাকা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না গিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে চাইছে।
সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে আরও কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।
এই শব্দগুলো কূটনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্য দেশের প্রভাব বিস্তারের ধারণা তৈরি হলে সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান থেকে মনে হচ্ছে, ঢাকা ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এমন একটি জায়গায় নিতে চাইছে যেখানে দুই দেশ পরস্পরের সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।
অর্থাৎ সম্পর্ক থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতা।
এতে কি দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন।
একদিকে সফর অনিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা, প্রত্যর্পণ এবং রাজনৈতিক আস্থার মতো বিষয়।
শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক পিছিয়ে গেলে এসব বিষয়ে আলোচনা আরও বিলম্বিত হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, পরিস্থিতি এখনো এমন পর্যায়ে যায়নি যে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।
কারণ বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী দেশ। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে একে অন্যকে এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে পানি বণ্টন, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—অসংখ্য ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
তাই সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও আলোচনার প্রয়োজন আরও বাড়ছে।
শীর্ষ বৈঠক কি শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয়?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, যত সমস্যা থাকুক, শেষ পর্যন্ত দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে মুখোমুখি বসতেই হবে।
কারণ লিখিত বার্তা, কূটনৈতিক নোট বা গণমাধ্যমে বক্তব্যের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
সরাসরি বৈঠকে নেতারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন। ভুল বোঝাবুঝি দূর করার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে এমন কিছু সমঝোতার পথও বের হতে পারে, যা প্রকাশ্যে আগে আলোচনা করা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও এই সরাসরি সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে।
ঢাকা যদি সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে চায়, তাহলে দিল্লির সঙ্গে আলোচনাই তার সবচেয়ে কার্যকর পথ। আবার ভারতও যদি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সামনে কী হতে পারে?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভারত বাংলাদেশের উত্থাপিত শর্তগুলোর বিষয়ে কী অবস্থান নেয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দিল্লির অবস্থান দ্রুত বদলানোর সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। ফলে এই একটি বিষয়ে সমাধান না হলে দ্বিপক্ষীয় সফর আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, সব আলোচনা শুধু প্রত্যর্পণের প্রশ্নে আটকে থাকলে দুই দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অমীমাংসিত থেকে যাবে।
বাংলাদেশের জন্য যেমন সীমান্ত হত্যা, পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের স্বার্থ রয়েছে।
তাই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই ফিরতে হবে দুই দেশকে।
‘অবিশ্বাস’ থেকে ‘নতুন বোঝাপড়া’—কোন পথে যাবে সম্পর্ক?
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পুরোনো সম্পর্কের হিসাব দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ঢাকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি—সবকিছুই সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
ঢাকার কঠোর শর্তকে তাই শুধু কূটনৈতিক চাপ হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর মধ্যে একদিকে যেমন অবিশ্বাসের প্রকাশ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই আছে সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরির আকাঙ্ক্ষা।
তবে সেই নতুন ভিত্তি তৈরি করতে হলে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে হবে।
দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু সেই মতপার্থক্য কীভাবে সামলানো হবে, সেটিই আসল বিষয়।
বাংলাদেশ যদি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে চায়, তাহলে ভারতের সঙ্গে সরাসরি ও নিয়মিত সংলাপ জরুরি। একইভাবে ভারতকেও বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না এখানে আটকে নেই।
আসল প্রশ্ন হলো, ঢাকা ও দিল্লি কি পুরোনো অবিশ্বাস কাটিয়ে নতুন একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে পারবে?
সম্ভাব্য সফর স্থগিত হওয়া হয়তো সেই পথকে কিছুটা কঠিন করেছে। কিন্তু সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্টও করে দিয়েছে। এখন দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, পরস্পরের অবস্থান এবং আলোচনার প্রস্তুতিই ঠিক করবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে কোন দিকে এগোবে।
একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চাইলে শুধু শর্ত দিলেই হবে না, সেই শর্তের পাশাপাশি সমাধানের পথও তৈরি করতে হবে। আর সেই পথের প্রথম ধাপ হতে পারে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য খোলামেলা, সম্মানজনক এবং সরাসরি আলোচনা।
— সংবাদ সংস্থার সাহায্য নিয়ে লেখা
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

